শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:১১ এএম, ২০২২-০৯-১৪
রাজধানীর প্রধান নাগরিক সমস্যাগুলোর অন্যতম হলো জলাবদ্ধতা। শহরজুড়ে গড়ে ওঠা অবকাঠামো, ভরাট হয়ে যাওয়া খাল-পুকুর-নালা আর দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার জেরে ঢাকার সড়কগুলো পরিণত হয়েছে জলাবদ্ধতার কেন্দ্রস্থলে। গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা আর তার কারণে সৃষ্ট তীব্র যানজট আরো একবার ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। বৃষ্টি হলে ঢাকার ছোট ছোট অনেক সড়কই তলিয়ে যায়। তবে গতকাল ফার্মগেট-বিমানবন্দর-টঙ্গী সড়কটির বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, যা যানজটকে আরো তীব্র, আরো দীর্ঘ করে। গতকাল দিনভরই এ সড়কে প্রচণ্ড যানজটের কবলে পড়েছে সাধারণ মানুষ। পাশাপাশি এ সড়কের যানজটের প্রভাব পড়ে গোটা ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর।
সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দরের আদলে তৈরি করা হচ্ছে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে টার্মিনালটি। শুরুতে এ পরিকল্পনার বড় অংশজুড়ে ছিল প্রাকৃতিক জলাধার। বনানী-বিমানবন্দর-টঙ্গী সড়কের পানি নিষ্কাশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত এ জলাধার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জলাধার ভরাট করে প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেয়া হয়েছে। একইভাবে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের অবকাঠামো তৈরি করতে গিয়ে ভরাট করা হয়েছে কমলাপুর-বিমানবন্দর রেলপথ ঘেঁষা জলাধারের সিংহভাগ। একই সড়কের উত্তরা-টঙ্গী অংশে চলছে বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের কাজ। যার কারণেও তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা।
অপরিকল্পিত উন্নয়ন আর প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা এখন বনানী-বিমানবন্দর-টঙ্গী সড়কের নিত্যসঙ্গী। ব্যতিক্রম হয়নি গত দুদিনের টানা বৃষ্টিতেও। জলাবদ্ধতার কারণে গতকাল সকাল থেকেই সড়কটিতে দেখা দেয় তীব্র যানজট। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ যানজট ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার সবক’টি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে।
ঢাকার ব্যস্ততম রুটগুলোর একটি ফার্মগেট-মতিঝিল। ২০১৯ সালে এ সড়কে শুরু হয় মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ। এজন্য সড়কের মাঝ বরাবর প্রায় ১১ মিটার জায়গা দীর্ঘদিন ঘিরে রাখা হয়। প্রশস্ততা কমে যাওয়ায় সড়কটির যানজট পরিস্থিতি মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে সড়কটির বেশির ভাগ ঘিরে রাখা অংশ খুলে দেয়া হয়েছে। এখন সড়কের প্রশস্ততা বাড়লেও যানজট পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ফার্মগেট-মতিঝিল সড়কের যানজট। সড়ক ব্যবহারকারীরা বলছেন, মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের কারণে সড়কটির ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভঙ্গুর দশায় চলে গিয়েছে।
সরেজমিন ফার্মগেট-মতিঝিল সড়ক ঘুরে এর সত্যতাও পাওয়া গিয়েছে। গতকাল টানা বৃষ্টির পর সড়কটির বিভিন্ন স্থানে মিডিয়ান ও ফুটপাত বরাবর পানি জমে থাকতে দেখা যায়। মেট্রোরেলের স্টেশন এলাকাগুলোর কোথাও কোথাও পানি জমেছে হাঁটু পর্যন্ত। জলাবদ্ধতার কারণে কোথাও কোথাও সড়কটি এতটাই সংকুচিত হয়েছে যে একটি গাড়ি চলার জায়গাও নেই। পানি জমে থাকা স্থানগুলোয় গাড়ি চলেছে থেমে থেমে, যা থেকে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ যানজট।
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, বৃষ্টি হলে একটা ‘রান অফ’ তৈরি হয়। কিছু পানি নিষ্কাশিত হয়ে মাটির ভেতরে চলে যায়। আবার কিছু পানি প্রবাহিত হয়ে চলে যায় আশপাশের জলাধার, খাল কিংবা পুকুরে। ঢাকার বেশির ভাগ জলাধার, খাল কিংবা পুকুর ভরাট করে ফেলা হয়েছে। আর সমতলে গড়ে তোলা হয়েছে কংক্রিটের অবকাঠামো। ফলে ঢাকায় বৃষ্টির পানি ভেতরে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। প্রবাহিত হয়ে চলে আসছে সড়কে।
তিনি আরো বলেন, সাধারণত কোনো শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে, যেন একটি ড্রেনেজ ব্যবস্থা দিয়ে বছরের পর বছর পার করে দেয়া যায়। কিন্তু আমাদের দেশে কাজটি করা হয় অস্থায়ীভাবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ড্রেনেজ ব্যবস্থাটি এক বছর বা একটি বর্ষা পার করার উপযোগী করে তৈরি করা হয়। আবার ঢাকার বেশির ভাগ ড্রেন তৈরি করা হয়েছে রাস্তার মাঝখানে। ফলে বছর বছর ড্রেন সংস্কার করতে গিয়ে রাস্তা খুঁড়ে রাখা হয়, যা জনভোগান্তি, যানজটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা বিদ্যমান ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন তো করতে পারছিই না, উল্টো শহরের মধ্যে এখনো যেসব প্রাকৃতিক জলাধার রয়েছে, সেগুলো নষ্ট করে ফেলছি। এমন প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতার কারণে সৃষ্ট জনভোগান্তি ও যানজট অনেক বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
বছর দুয়েক আগে ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার দায়িত্ব বুঝে পেয়েছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। বনানী-বিমানবন্দর-টঙ্গী সড়কের জলাবদ্ধতা সম্পর্কে গতকাল একাধিকবার চেষ্টা করেও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পরে যোগাযোগ করা হলে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। এখানে মহাসড়ক বিভাগের তেমন কোনো কাজ নেই। ঢাকা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ড্রেনগুলো ঠিকমতো পরিষ্কার না করায় গতকালের জলাবদ্ধতা ও যানজট পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে এ সময় মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ঢাকার উন্নয়নে কাজ করছে সরকারের আট মন্ত্রণালয়ের ২৬টি বিভাগ। যানজট পরিস্থিতি উন্নয়নে কাজ করা সংস্থার সংখ্যা বেশি হলেও সেগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। তিনি বলেন, প্রতিটি সংস্থা নিজেদের মতো করে উন্নয়ন করছে। কেউ রাস্তা কাটছে, তো কেউ বানাচ্ছে। তাদের উন্নয়নগুলো একটি আরেকটির সঙ্গে জট পাকিয়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে অপরিকল্পিত উন্নয়ন।
তিনি আরো বলেন, বৃষ্টির দিনে ঢাকায় যানজট বেড়ে যায়। জলাবদ্ধতার কারণে গাড়ি চলাচলের পথ সরু হয়ে যায়। এতে গাড়ির গতি কমে যায়। আবার ইঞ্জিনে পানি ঢুকে বিকল হওয়া গাড়িও যানজট বাড়িয়ে দেয়। জলাবদ্ধতা বড় সমস্যা হলেও সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়নে এ বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারকরা খুব একটা গুরুত্ব দেন না। যারা প্রকল্প অনুমোদন করেন, তারা এটা বোঝেন না যে সেই প্রকল্প ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নতি করার বদলে প্রাকৃতিক জলাধারগুলোও ধ্বংস করে দিচ্ছে। সূত্র: বণিক বার্তা
প্যা.ভ/তা
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত