শিরোনাম
Passenger Voice | ০১:৩১ পিএম, ২০২২-০৯-০১
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ঘুষ ও দুর্নীতির উভয় অপকর্মে তৃতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) 'সেবা খাতে দুর্নীতি :জাতীয় খানা জরিপ ২০২১'-এ এমন চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল বুধবার ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবির পক্ষ থেকে এ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
আন্তর্জাতিক মানের আট গবেষকের তত্ত্বাবধানে এই জরিপ তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে টিআইবি। তথ্যের বিবেচ্য সময় ছিল ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০২১ সালের ৩০ নভেম্বর। ২০২১ সালের ১৩ ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের ৮ মার্চ এই সময়ের মধ্যে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
টিআইবির গবেষক ফারহানা রহমান ও মোহাম্মদ নূরে আলমের উপস্থাপন করা প্রতিবেদনে বলা হয়, বিআরটিএতে গ্রামের ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ আর শহরে ৬৬ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার দুর্নীতির শিকার হয়েছে। এ খাতে দুর্নীতির শিকার ৬৮ দশমিক ৩ শতাংশ আর ঘুষের শিকার ৫০ দশমিক ২ শতাংশ। তথ্য বলছে উল্লেখিত সময়ে বিআরটিএ'তে ৬৪০ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে।
বিআরটিএর বর্তমান চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদারের নিজ জেলা ফেনী সার্কেলে এক বছরে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে প্রায় ২ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেন হয়েছে বলে বিভিন্ন অনুসন্ধানে পাওয়া যায়। এই বিষয়ে আগামী পর্বে বিস্তারিত পড়ুন>>> “ঘুষ খোরদের বাহুবলে ফেনী বিআরটিএ, পিয়ন থেকে কর্তাব্যক্তি সবাই জড়িত”।
টিআইবির গবেষনায় দেখা যায়, শহরের চেয়ে গ্রামের মানুষ বেশি দুর্নীতির শিকার হয়েছে। একইভাবে শিক্ষিত খানার চেয়ে বেশি দুর্নীতির শিকার হয়েছে অল্প শিক্ষিত খানা। প্রতিবন্ধী খানার দুর্নীতির শিকার হওয়ার চিত্রও তুলনামূলক বেশি। মধ্যবয়সীদের চেয়ে বেশি বয়সী খানাও তুলনামূলক বেশি দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হয়েছে।
বিআরটিএর ঘুষ ও দুর্নীতি কারন ও ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক চেয়ারম্যান আইয়ুবুর রহমান প্যাসেঞ্জার ভয়েসকে বলেন, বিআরটিএ’তে চোখে দেখে ফিটনেস প্রদান আর নামমাত্র পরীক্ষা নিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে সবচেয়ে বেশি ঘুষ দুর্নীতি হয়ে থাকে। বিআরটিএ ড্রাইভিং লাইসেন্স আবেদন পত্রে কোন অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে ড্রাইভিং শিখেছে সেই কলাম থাকলেও সেটার বাস্তবায়ন এখনও মুখথুবড়ে পরে আছে।
তিনি আরো বলেন, বিআরটিএ প্রশাসন শাখা সার্কেল অফিসের দুর্নীতি বন্ধে কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব চাইতে পারে। কোন কর্মকর্তা-কর্মচারী সম্পদের সঠিক হিসাব না দিলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এছাড়াও ঘুষ-দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের তালিকা করে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদকের সহযোগীতা নিতে পারে।
১৯৯৭ সালে শুরু হয়ে এ নিয়ে নবমবারের মতো দেশের সেবা খাতের দুর্নীতিবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করলো টিআইবি। সর্বশেষ ২০১৭ সালে সেবা খাতের দুর্নীতিবিষয়ক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সেটির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, ওই সময়ের চেয়ে এবার দুর্নীতি ও ঘুষ- উভয়ের মাত্রাই বেড়েছে। ২০১৭ সালে সাড়ে ৬৬ শতাংশ খানাকে (পরিবার) ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হতে হয়েছিল। ২০২১ সালে তা বেড়ে ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। ২০১৭ সালে প্রতিটি খানাকে গড়ে ঘুষ দিতে হয়েছিল ৫ হাজার ৯৩০ টাকা। ২০২১ সালে তা হয়েছে ৬ হাজার ৬৩৬ টাকা। এবার মাথাপিছু ঘুষের পরিমাণ ৬৭১ টাকা। ২০১৭ সালে জাতীয় পর্যায়ে মোট ঘুষ ছিল ১০ হাজার ৬৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এবার মোট ঘুষ ১০ হাজার ৮৩০ কোটি ১০ লাখ টাকা, যা গত জরিপের চেয়ে ১ দশমিক ২ শতাংশ বেশি।
টিআইবি জানায়, জরিপের আওতায় আটটি বিভাগীয় শহরের মোট ১৫ হাজার ৪৫৪টি খানার ওপর জরিপ করা হয়। এর মধ্যে গ্রামাঞ্চলের খানা ছিল ৯ হাজার ৬৫২টি। শহরাঞ্চলের খানা ছিল ৫ হাজার ৮০২টি। সার্বিকভাবে দৈবচয়নের মাধ্যমে খানাগুলো নির্বাচন করা হয়। এর মধ্যে নারী ছিলেন ৪৯ দশমিক ৭৭ শতাংশ। পুরুষ ৫০ দশমিক ২১ শতাংশ। তৃতীয় লিঙ্গের ছিল দশমিক ০২ শতাংশ। ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছিলেন ৮৯ শতাংশ আর হিন্দু ধর্মাবলম্বী ৯ দশমিক ১ শতাংশ। অন্য ধর্মের ছিলেন ১ দশমিক ৯ শতাংশ।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মত :জরিপে অংশগ্রহণকারীর ৭২ দশমিক ১ শতাংশ মনে করেন, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না। তারা ঘুষ দেন হয়রানি বা ঝামেলা এড়াতে। খানাপ্রধানের প্রতিবন্ধিতা থাকলে দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হওয়ার প্রবণতা বেশি। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা কম দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। বেশি দুর্নীতির শিকার হয়েছেন ৫৬ থেকে ৬৫ বছর বয়সীরা। দুর্নীতির শিকার হলেও অভিযোগ করেননি ৭৯ দশমিক ২২ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। এর মধ্যে ৫৫ শতাংশ অভিযোগ করেননি ঝামেলা বা হয়রানির ভয়ে। সব খানেই দুর্নীতি- তাই অভিযোগ করার প্রয়োজন বোধ করেননি ৪৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী। সাড়ে ১৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী দুর্নীতির অভিযোগ করেছেন। তবে ৭২ শতাংশ অভিযোগের ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অভিযোগের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
টিআইবির সুপারিশ :দুর্নীতি থেকে উত্তোরণে টিআইবি ১০ দফা সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের অবস্থান, পরিচয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, এ ক্ষেত্রে বিভাগীয় পদক্ষেপের পাশাপাশি প্রযোজ্য ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সক্রিয় ভূমিকা পালন করা, দুর্নীতি রোধে সেবাদান প্রক্রিয়া ডিজিটালাইজড করা, সেবাদানের সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মানদণ্ডের ওপর ভিত্তি করে পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থা করা, যেসব খাতে জনবলের ঘাটতি রয়েছে সেটা দূর করা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা ও অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনের পরিবেশ সৃষ্টি করা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধে সব পর্যায়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সার্বিকভাবে সেবা খাতের দুর্নীতির এই চিত্র উদ্বেগজনক। ছোট দুর্নীতির মাত্রা এত ব্যাপক হলে বড় প্রকল্প ও বড় কেনাকাটায় দুর্নীতির মাত্রা আরও বেশি বলেই ধারণা করা যায়। দুর্নীতি প্রতিরোধের ব্যবস্থা সরকারের কাছে আছে। তবে বাস্তবে সেগুলোর প্রয়োগ দেখা যায় না।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত