৮ মাসে ১ কোটি ১৪ লাখ টাকার ঘুষ আদায় মোটরযান পরিদর্শকের

সরকারী প্রতিষ্ঠানও ঘুষ দিতে হয় মেহেরপুর বিআরটিএতে

Passenger Voice    |    ০৪:৫৩ পিএম, ২০২২-০৬-১১


সরকারী প্রতিষ্ঠানও ঘুষ দিতে হয় মেহেরপুর বিআরটিএতে

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ জিয়াউর রহমান, মেকানিক্যাল এ্যাসিস্ট্যান্ট বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর সার্কেলের মোটরযান পরিদর্শক (অঃ দাঃ) হিসেবে কর্মরত। বিআরটিএর এই কর্মচারীকে ২০২০ সালের ১৯ মার্চ সদর কার্যালয়ের এক আদেশে ভোলা জেলা সার্কেল থেকে এই সার্কেলে বদলী করে কর্তৃপক্ষ।  তার বিরুদ্ধে ভোলা সার্কেলে কর্মরত অবস্থায় বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতির ডজন খানেক অভিযোগ ছিল। তার মধ্যে সব চেয়ে বেশি অভিযোগ ছিল অর্থ দুর্নীতির। যে কোন সেবা প্রত্যাশিরা এই মোটরযান পরিদর্শককে দিতে হতো আর্থিক সুবিধা। ঘুষের টাকা না পেলে কোন ধরনের গ্রাহক সেবা প্রদান করতেন না তিনি। বিআরটিএ ভোলা সার্কেল থেকে চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর সার্কেলে বদলী হয়েও তাঁর ঘুষ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন দেদারসে। 

এই ঘুষখোর মোটরযান পরিদর্শক শুধু সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করছেন না, প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার SEIP প্রকল্পের প্রশিক্ষনার্থী চালকরাও এই ঘুষের আওতা থেকে বাদ পড়ছেনা। তাদের কাছেও জন প্রতি ৩ হাজার করে ঘুষ দাবী করা হয়েছে। টাকা দিতে অস্বীকার কারী চালকদের পরীক্ষায় ফেল করানো হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়েই ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রত্যাশিরা দালালের মাধ্যমে টাকা দিয়ে পরীক্ষায় পাস করতে হচ্ছে। প্যাসেঞ্জার ভয়েসের একটি সূত্র বলছে, মেহেরপুর টেকনিক্যাল টেনিং সেন্টার, টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ ও সমাজসেবা অধিদপ্তরও এই মোটরযান পরিদর্শককে ঘুষ প্রদান করতে হচ্ছে। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চালকদের বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি করার জন্য অগ্রাধিকার প্রকল্পের মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনা টাকায় বেকার যুবকদের প্রশিক্ষন প্রদান করছেন। এই প্রকল্পের আওতায় মেহেরপুর টেকনিক্যাল টেনিং সেন্টার প্রতি তিন মাস পরপর ৮০ জনকে, টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজ ৪০/৫০ জনকে ও সমাজসেবা অধিদপ্তর প্রতি ৪৫ দিতে ৬০ জনকে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রদান করছে। এই সকল বেকার যুবকদের শুধু ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ নয় প্রতিদিন যাতায়াত ভাতা হিসেবে প্রতি ছাত্রকে ১০০ টাকা করে ভাতা প্রদান করছেন। এছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহনের জন্য লার্নার তৈরির ফি এবং লাইসেন্স ফি ও সরকার প্রদান করছে। 

তবে বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শককের চাহিত ঘুষের টাকা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রদান না করায়, বেকায়দায় পরে প্রশিক্ষণ নিতে আসা বেকার যুবকদের। 

বিআরটিএর এই দুর্নীতিবাজ মোটরযান পরিদর্শক ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে চলতি বছরের ৯ জুন পর্যন্ত ৮ (আট) মাসে ৩৭৯৩ টি ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করার জন্য সহকারী পরিচালক বরাবরে সুপারিশ করেছেন। ড্রাইভিং কম্পিটেন্সি টেষ্ট বোর্ডের পরীক্ষায় পাস করে বিআরটিএর সফটওয়্যারে ডাটা এন্টি করা হয়েছে। তারমধ্যে বায়োমেট্রিক গ্রহন করা হয়েছে ৩৬৬৭ টি। এইসব ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করতে ও পরীক্ষায় পাস করাতে প্রায় ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা ঘুষ বাণিজ্য করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তবে মেহেরপুর সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) আইনুল হুদার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি প্যাসেঞ্জার ভয়েসকে বলেন, আমার সার্কেলে এতগুলো ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু হয়নি। গত মে মাসে মাত্র ১ টি বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মাত্র ৪০ জন পাস করেছে। তবে প্যাসেঞ্জার ভয়েসের তথ্য বলছে এই সার্কেলে প্রতিমাসে গড়ে ৫০০ জন ব্যক্তি লাইসেন্স পাচ্ছে। এবং প্রতিটি ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রত্যাশি ড্রাইভিং কম্পিটেন্সি টেষ্ট বোর্ডের পরীক্ষায় পাস করতে মাথাপিছুৃ ৩ হাজার টাকা করে ঘুষ দিতে হয় এই মোটরযান পরিদর্শককে। 

তবে মেহেরপুর জেলা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মো. নাজমুল হুদাকে প্রতি পরীক্ষার্থী নিদিষ্ট পরিমান ঘুষ দিতে হয় বলে প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছেন এই মোটরযান পরিদর্শক। সূত্র বলছে ড্রাইভিং টেষ্ট পরীক্ষায় প্রতি বোর্ডে ১২০ জন থেকে ১৫০ জন পর্যন্ত আবেদনকারীকে পরীক্ষায় পাস দেখানো হলেও পরীক্ষায় অংশগ্রহন করেন মাত্র ২০ থেকে ৩০ জন ব্যক্তি । বাকীদের কাছ থেকে ঘুষ আদায় করে পরীক্ষা ছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান করছেন। ফলে রেজুলেশন স্বাক্ষর করানোর জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মো. নাজমুল হুদাকে জনপ্রতি নিদিষ্ট পরিমান ঘুষের ভাগ প্রদান করতে হয় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছেন। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মেহেরপুর টেকনিক্যাল টেনিং সেন্টারের এক ইন্সট্রাক্টর বলেন, আমরা বেকার যুবকদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় বিনামূল্যে ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ প্রদান করি।  প্রশিক্ষনার্থীরা ড্রাইভিং লাইসেন্স চেয়ে আবেদন কারার পর পরীক্ষার্থীদের ঢালাও ভাবে অকৃতকার্য করা হয়। পরে দিত্বীয় দফায় জন প্রতি ৩ হাজার টাকা দাবী করা হয়। আর সেই টাকার প্রদানের জন্য পরিদর্শকের ক্যাশিয়ারের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে আমাদের টেনিং সেন্টারের ৪০ জন ছাত্র পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করেন। মোটরযান পরিদর্শকের নিদিষ্ট পরিমান ঘুষের টাকা না দেয়ায় ২৭ জন ছাত্রকে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেয়। পরে ৩ হাজার টাকা করে ঘুষ আদায় করে পরবর্তী পরিক্ষায় পাস করিয়েছেন তিনি। 

মেহেরপুর বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) আইনুল হুদা জানান, ড্রাইভিং পরীক্ষায় পাস করাতে ঘুষ নেয়ার বিষয়টি আমি তদন্ত করে দেখবো। যদি প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে মোটরযান পরিদর্শকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। 

মেহেরপুর জেলা অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মো. নাজমুল হুদা প্যাসেঞ্জার ভয়েসকে বলেন, ড্রাইভিং কম্পিটেন্সি টেস্ট বোর্ডে যে সকল ম্যাজিষ্ট্রেটগণ যায় আমি সবাইকে এই বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করবো। এবং ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি আমি তদন্ত করে দেখছি। প্রমাণ পাওয়া গেলে আমি বিআরটিএ কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাবো।