অপরিপক্ক চালক, চাঁদাবাজী ও পুলিশের ‘মান্থলী’ দিয়ে চলে ১ নং রুটের অটোটেম্পু

Yasin Hoque    |    ০৬:৪১ পিএম, ২০২০-০৩-১০


অপরিপক্ক চালক, চাঁদাবাজী ও পুলিশের ‘মান্থলী’ দিয়ে চলে ১ নং রুটের অটোটেম্পু

ইয়াছিন হক : রয়েছে অপরিপক্ক চালক, সড়কের চাঁদাবাজী, পুলিশকে দিতে হয় মান্থলী এভাবে অদক্ষ চালকের হাতে নগরীর ১ নং রুটের অটোটেম্পু গুলো সড়কে দাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। এইসব যানবাহনে প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে রয়েছে সাধারণ যাত্রীরা। কোনো প্রকার ট্রেনিং কিংবা লাইসেন্স ছাড়াই চালকরা চট্টগ্রাম নগরীতে সিএনজি অটোরিক্সা, অটোটেম্পু, ইজিবাইক সড়কে চালাচ্ছে। এসব বাহনের চালকরা জানেই না যে সড়কে যানবাহন চালাতে হলে বিআরটিএ থেকে ট্রেনিং এবং লাইসেন্স গ্রহণ করতে হয়। যার ফলে দিন দিন প্রাণহানি ঝুঁকি বেড়েই চলছে। সড়কে চাঁদাবাজীর কারনে অতিরিক্ত ভাড়ার নামে যাত্রীদের পকেট কাটছে।

এদিকে এসব অদক্ষ চালকের হাতে যানবাহন দুর্ঘটনায় যাত্রী সাধারণ নিহত কিংবা হতাহত হলেও প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্টদের মধ্যস্থতার কারণে তারা শাস্তির আওতায় আসছে না। অদক্ষ এসব চালকরা দেখেশুনে যানবাহন চালানো শিখলেও নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। তাদের জানা নেই ট্রাফিক আইন কিংবা সড়কের নিয়ম-কানুন।

নগরির চকবাজার থেকে বারেক বিল্ডিং রুটে চলাচলকারী অটো টেম্পো গুলোতে যেমন রয়েছে অপরিপক্ক চালক, রয়েছে ফিটনেস বিহীন যান, শ্রমিক নেতাদের চাঁদাবাজী, পুলিশের “মান্থলি”র নামে চাঁদা আদায়। অভিযোগ রয়েছে, এই গাড়ীগুলো থেকে শ্রমিক নেতা ও পুলিশের নামে প্রতি মাসে ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা চাঁদাবাজী হয়ে থাকে। তবে এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে নারাজ এই রুটের অটোটেম্পু চালক-মালিক ও শ্রমিকরা। 


বিআরটিএর তথ্য মতে চট্টমেট্রো আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির অনুমোদিত ১ নং রুটের যানবাহনগুলো চলাচলের কথা ছিল অক্সিজেন- আতুরারদিপো- মুরাদপুর-চকবাজার-গনি বেকারী- কাজীর দেউড়ি- টাইগারপাস- দেওয়ানহাট- চৌমুহনি হয়ে বারেক বিল্ডিং মোড় পর্যন্ত। কিন্তু এইসব অটোটেম্পু গুলো চলছে বারেক বিল্ডিং থেকে চকবাজার পর্যন্ত। যা বিআরটিএর ভাষায় পারমিটের শর্ত ভঙ্গ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে এইসব অটোটেম্পুর বিরুদ্ধে সড়ক পরিবহন আইনের ৭৭ নং ধারা অনুযায়ি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ট্রাফিক পুলিশের। সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ এর ৭৭ ধারায় বলা হয়েছে রুট পারমিট ব্যতীত পরিবহন যান চালনা করা বা চালনার অনুমতি দেওয়া ব্যক্তির অনধিক ৩ মাসের কারাদন্ড বা অনধিক ২০ হাজার টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ড হতে পারে। 

বিআরটিএ নির্ধারিত ১৭টি রুটে অটোটেম্পু হিসেবে দুই হাজারের কিছু কম গাড়ির পারমিট রয়েছে। পারমিটযুক্ত এসব গাড়ির সাথে চলছে পারমিটবিহীন দুই হাজারেরও বেশি গাড়ি। যার মধ্যে রয়েছে টিকটিকি (সবুজ টেম্পু), এইচ-পাওয়ার, লেগুনা, টমটম, ম্যাক্সিমাও। এসব গাড়ি চলাচলের জন্য পুলিশকে মাসোহারা দিতে হয়। আবার লাইনভুক্তির জন্যও এককালীন ৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত গুণতে হয় মালিকদের। দৈনিক লাইন খরচ দিতে হয় ৮০ টাকা করে। এই রুটে চলাচল করে প্রায় ২৫০ টিরও বেশি অটোরিক্সা। যা গড়ে দৈনিক ২০ হাজার টাকা করে মাসে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত লাইন খরচের নামে চাঁদা আদায় করা হয়। এই রুটে চলাচলের পারমিট আছে এমন অটোটেম্পু গুলোকে ‘মান্থলী’ দিতে হয় ১ হাজার টাকা। অন্যদিকে পারমিট নেই তবুও এই রুটে চলছে এমন গাড়ীকে দিতে হয় তিন হাজার টাকা। যা প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকার মতো।

১ নং রুটের চাঁদা উত্তোলনকারী লাইনম্যান ইকবালের সাথে কথা হলে তিনি প্যাসেঞ্জার ভয়েসকে বলেন, এই রুটে পারমিট বিহীন অটোটেম্পু গুলোর চলাচলের জন্য আমরা পুলিশকে সাপ্তাহিক ও মান্থলি দিয়ে থাকি। তাই চলাচলের কোন সমস্যা হয় না।

এদিকে গত শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে দেশের পরিবহন খাতকে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের চাঁদাবাজির হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ অটোরিক্সা-অটোটেম্পু পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতারা। তারা লাইসেন্স ও অন্যান্য কাগজপত্র সরবরাহের সময় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কর্মকর্তাদের দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধ করতেও সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম ফারুক বলেন, পরিবহন খাতের উন্নয়নের স্বার্থে সরকারকে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। ‘আমরা চেকপোস্টে গাড়ির কাগজপত্র পরীক্ষার নামে ট্রাফিক পুলিশের হয়রানির শিকার হই। এটা অবশ্যই শিগগির বন্ধ করতে হবে।’ সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ তে শ্রমিক স্বার্থবিরোধী কিছু ধারা রয়েছে এবং এগুলো বাতিল করতে হবে। ‘চালকদের নিয়োগপত্র দিতে হবে এবং দক্ষ চালক তৈরিতে সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।

এই রুটের নিয়ন্ত্রনকারী চট্টগ্রাম জেলা অটোরিকশা-অটোটেম্পু শ্রমিক ইউনিয়ন – রেজি: নং ১৪৮৭ এর সাধারণ সম্পাদক দিলিপ সরকার প্যাসেঞ্জার ভয়েসকে বলেন , দৈনিক আমরা একটা ওয়াবিল নিয়ে থাকি যা শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য শ্রমিক কল্যাণ ফান্ডে জমা করা হয়। তাছাড়া পারমিটবিহীন গাড়ি গুলো প্রশাসনকে ম্যানেজ করে চালানো হয়। 

এই বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক উত্তর বিভাগের শহর ও যানবাহন পরিদর্শক (প্রশাসন) মহিউদ্দিন খান প্যাসেঞ্জার ভয়েসকে বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমি অবগত না তবে প্রশাননের কেউ যদি এই বিষয়ে জড়িত থাকে, তা আমাদেরকে জানালে অবশ্যই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বন্দর বিভাগের শহর ও যানবাহন পরিদর্শক (প্রশাসন) মোঃ মশিউর রহমান প্যাসেঞ্জার ভয়েসকে বলেন, “বন্দর জোনের মধ্যে যেই যেই পয়েন্ট ১ নং রুটের অটোটেম্পু গুলো থেকে  টাকা নেয়া হচ্ছে তার নির্দিষ্ট প্রমান পাওয়া গেলে চাঁদাবাজদের সরাসরি হাজতে পাঠানো হবে। এছাড়াও গত ৮ মার্চ থেকে লাইসেন্স বিহীন চালকদের বিরুদ্ধে ট্রাফিক প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করে আসছে।