'মাইলেজ ভাতা' কমানোয় আন্দোলনে রেলকর্মীরা

Passenger Voice    |    ০৯:২৩ পিএম, ২০২১-১২-১৮


'মাইলেজ ভাতা' কমানোয় আন্দোলনে রেলকর্মীরা

রেলে 'মাইলেজ ভাতা' কমিয়ে দেওয়ায় আন্দোলন শুরু করেছেন 'রানিং স্টাফ'রা। দাবি আদায়ে মাঝেমধ্যে কৌশলে ট্রেনের গতি কমিয়ে দিচ্ছেন তারা। ফলে অনেক ট্রেন নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছছে না। এতে বিপাকে পড়েছে রেলওয়ে। আন্দোলনকারীরা ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।

লোকোমাস্টার (চালক), গার্ড, টিটি, অ্যাটেনডেন্টসহ চলন্ত ট্রেনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মীদের 'রানিং স্টাফ' বলা হয়। বেতনের বাইরেও যত মাইল দায়িত্ব পালন করেন এবং অতিরিক্ত সময় কাজ করেন, তার জন্য নির্দিষ্ট হারে ভাতা পেয়ে থাকেন তারা। এটা রেলে 'মাইলেজ ভাতা' হিসেবে পরিচিত। দেড়শ বছর ধরে এই সুবিধা পেয়ে এলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের কারণে কমে যাচ্ছে এই ভাতা।

তারা বলছেন, ভাতা কমানো হলে অতিরিক্ত কাজ করবেন না। আর এতে কমে যাবে ট্রেন চলাচল।

রানিং স্টাফরাই সরাসরি ট্রেন পরিচালনা করে থাকেন। রেলওয়েতে প্রায় আড়াই হাজার রানিং স্টাফ আছে। রেলওয়ে সূত্র জানায়, ৩ নভেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রজ্ঞাপনে মাইলেজ ভাতা নির্ধারিত করে দেওয়া হয়। সর্বশেষ দুই দশকেরও বেশি সময় আগে রেলওয়ের সংস্থাপন কোড অনুযায়ী রেলওয়ের ট্রাফিক রানিং স্টাফ এবং লোকোমোটিভ রানিং স্টাফদের মূল বেতনের ভিত্তিতে ভাতা প্রদান করা হয়। খবর সমকাল 

সম্প্রতি জারি করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, চলন্ত ট্রেনে দৈনিক ১০০ কিলোমিটার কিংবা তার চেয়েও বেশি দায়িত্ব পালন করলেও ওই দিনের বেতনের ৭৫ শতাংশের বেশি মাইলেজ ভাতা পাবেন না রানিং স্টাফরা। মাস শেষে এই ভাতা মূল বেতনের বেশি হবে না।

আগে চলন্ত ট্রেনে যত কিলোমিটার দায়িত্ব পালন করতেন, সেই অনুপাতে ভাতা পেতেন রানিং স্টাফরা। মাসে ৮ থেকে ১০ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন অনেকে। কিন্তু নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সর্বোচ্চ তিন হাজার কিলোমিটারের জন্য ভাতা পাবেন তারা। বিদ্যমান ভাতা সুবিধা বহাল রাখা না হলে এর বেশি কাজ করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তারা।

জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারির পরপরই রানিং স্টাফরা ক্ষোভ প্রকাশ করার পাশাপাশি কৌশলে ট্রেনের গতি কমিয়ে দেন। নির্দিষ্ট সময় ও গতি মেনে ট্রেন চালানোর কথা বলে ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী ট্রেনের গতি কমিয়ে দেন তারা। এতে অনেক ট্রেনের গন্তব্যে পৌঁছাতে আধা ঘণ্টার বেশি অতিরিক্ত সময় লেগে যায়। সম্প্রতি চট্টগ্রাম থেকে আখাউড়া পর্যন্ত যাওয়ার পর একটি মালবাহী ট্রেনের রানিং স্টাফরা ১০০ কিলোমিটার দায়িত্ব পালন শেষ হয়েছে জানিয়ে ট্রেন থেকে নেমে যান। এতে ট্রেনটি বন্ধ হয়ে যায়। সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা ওই কর্মীদের সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে ট্রেনটি গন্তব্যে পৌঁছান।

রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও শ্রমিক-কর্মচারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মজিবুর রহমান বলেন, '১৮৬২ সাল থেকে রেলওয়ে অ্যাক্ট অনুযায়ী রানিং স্টাফরা মাইলেজ ভাতা পেয়ে আসছেন। কিন্তু সরকার একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই ভাতা সুবিধা সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। এ নিয়মের ফলে অতিরিক্ত ডিউটি করেও সেই অনুপাতে ভাতা পাওয়া যাবে না। তাছাড়া কোনো সুবিধা দিয়ে তা প্রত্যাহারেরও সুযোগ নেই। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে তাই করা হয়েছে। নতুন নিয়ম বহাল থাকলে রানিং স্টাফরা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করবেন না। ভাতা কমানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা না হলে ট্রেনের চাকাও বন্ধ হয়ে যাবে। বেশি কাজ করে কম ভাতা নিয়ে কাজ করবেন না রানিং স্টাফরা।'

রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম মামুন বলেন, রানিং স্টাফদের ভাতা কমিয়ে দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করার পর তারা কর্মবিরতির মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিল। এই ধরনের কর্মসূচি পালন করা হলে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। বিষয়টি স্পর্শকাতর। এজন্য তারা স্টাফদের শান্ত রেখেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত কাজের বিপরীতে প্রাপ্য ভাতা না পেলে তাদের বোঝানো যাবে না।

সূত্র জানায়, রানিং স্টাফদের অনড় অবস্থানের কারণে ট্রেন পরিচালনায় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত বিষয়টির সুরাহা করতে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে তাগাদা দেওয়া হচ্ছে রেলওয়ে থেকে। রানিং স্টাফ সংগঠনের নেতারা রেলপথ মন্ত্রীর নূরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে দেখা করেছেন। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে মন্ত্রী তাদের আশ্বস্ত করেছেন। এ নিয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্তও হয়েছে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, মাইলেজ ভাতার বিষয়টি সরকারি সিদ্ধান্ত। তবে এ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনে রেলওয়ে ও রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনী উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আশা করি, বিষয়টি সমাধান হয়ে যাবে।

জানা গেছে, প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন রানিং স্টাফরা। রেলের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত বিক্ষোভ, অবস্থান ও ঘেরাও কর্মসূচি পালন করছে তারা। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, পাকশী ও লালমনিরহাটেও অভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।