শিরোনাম
Passenger Voice | ০১:৩২ পিএম, ২০২১-১০-৩০
লোকাল আর আন্তঃনগর ট্রেন যেন একাকার হয়ে গেছে। দূরপাল্লার ট্রেনগুলো রীতিমতো লোকাল ট্রেনে পরিণত হচ্ছে। অথচ এসব ট্রেন সরাসরি অথবা দুই-একটি স্টেশন ধরেই গন্তব্যে যাওয়ার কথা। কিন্তু কোনো কোনো ট্রেন ২৩ টি স্টেশনেও থামছে। যা লোকাল ও মেইল ট্রেনকেও হার মানিয়েছে। এর নেপথ্যে রয়েছে রাজনৈতিক নেতা, সরকারি হামলাসহ বিভিন্ন খাতের ভিআইপি। তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী আন্তঃনগর মুহূর্তেই হয়ে যায় লোকাল।
এক্ষেত্রে একরকম অসহায় রেলের সংশ্লিষ্টরা। এতে যাত্রী সেবা লাটে উঠছে। লোকসান বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। অপরিকল্পিতভাবে যাত্রা বিরতি দেওয়ায় সিডিউল বিপর্যয়সহ বিনাটিকিটি সংখ্যাও বাড়ছে। আবার খালি থাকছে উল্লেযোগ্যসংখ্যক আসন। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বলছেন, কোনো রুটে নতুন ট্রেন চলবে-কোথায় যাত্রা বিরতি হবে-তা নির্ধারিত হয় ভিআইপিদের ইশারায়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ১০৪টি আন্তঃনগর ট্রেনের মধ্যে মাত্র তিনটি বিরতিহীন ট্রেন রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, জনপ্রতিনিধিরা সাধারণ মানুষের জন্য রাজনীতি করে। সাধারণ মানুষের চাহিদা অনুযায়ী, আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর যাত্রাবিরতি দিতে হচ্ছে। তাছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্যরা ট্রেন যাত্রা বিরতি দিতে ডিও লেটার দিচ্ছে। সাধারণ মানুষ কখনো কখনো স্টেশন অবরোধ করছে।
সাধারণত আন্তঃনগর ট্রেন বিরতিহীন হয় স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, নতুন আন্তঃনগর ট্রেন চালুর সময় নামে মাত্র কয়েকটি স্টেশনে যাত্রা বিরতি দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে বাধ্য হয়েই যাত্রা বিরতি বাড়াতে হচ্ছে। তবে, আমরা আরও নতুন ট্রেন চালু করব। নতুন ট্রেনের মধ্যে নন স্টপ ট্রেনও থাকবে। সোনার বাংলা, সুবর্ণ ও বনলতা আন্তঃনগর এক্সপ্রেস নন স্টপ চলছে। নন স্টপ ট্রেনের কোনো বিকল্প নেই-এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমরা রাজনৈতিক নেতারা সাধারণ মানুষের কাজ করি। তাদের চাহিদা-দাবি মানতেই হবে। তবে আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর খুব একটা বেশি যাত্রাবিরতি দেইনি।
রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে বিভাগ সূত্রে জানা যায়, অধিকাংশ সময় রাজনৈতিক নেতাদের চাপে বিভিন্ন স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের অতিরিক্ত যাত্রা বিরতি দিতে হচ্ছে। মাঝপথে যাত্রা বিরতি স্টেশনগুলোয় নামমাত্র টিকিট বিক্রি হয়। বেশিরভাগ লোকজনই এসব স্টেশন থেকে উঠে পরবর্তী স্টেশনে নেমে পড়ছে। মাঝ পথের স্টেশনগুলোয় ট্রেন দাঁড়ানোর কারণে স্থানীয় লোকজনই বেশি ওঠে।
বিনাটিকিটের যাত্রীদের সঙ্গে ট্রেনে থাকা দায়িত্বরত টিটিই কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকজনও পেরে ওঠে না। টিকিট চাইতে গেলে কিংবা জরিমানা করলেই বিপদ বাধে। পরবর্তী স্টেশনে নেমে ট্রেন ভাঙচুর, টিটিইকে মারধরের অসংখ্য নজির রয়েছে।
পশ্চিমাঞ্চল রেলের সিরাজগঞ্জের ক্যাপ্টেন মনসুর আলী রেলস্টেশনে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে আসা এবং ঢাকা থেকে পশ্চিমাঞ্চলে যাওয়া প্রায় সব আন্তঃনগর ট্রেন থামে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চালু হওয়া নতুন আন্তঃনগর ট্রেনেরও যাত্রা বিরতি দিতে হয়েছে শুধু রাজনৈতিক কারণে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ে পরিবহণ ও অপারেশন দপ্তরের দুইজন কর্মকর্তা প্রায় অভিন্ন তথ্য দিয়ে বলেন, বছরের অসংখ্য ডিও লেটার আসে শুধু আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রা বিরতি দিতে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এমনও বহু ট্রেন রয়েছে মাত্র ১টি স্টেশনের পর পরবর্তী স্টেশনে যাত্রা বিরতি দিতে হচ্ছে। আবার জনপ্রতিনিধিদের চাপে মাঝ পথেও এসি চেয়ার এবং এসি কেবিনের আসন দিতে হচ্ছে। এসব আসন মূলত যাত্রার শুরু থেকে শেষ পযর্ন্তই শতভাগ বিক্রি হয়। মাঝ পথের এসব সিটগুলো প্রায়ই অবিক্রীত থাকে। বিনাটিকিটি যাত্রীরা এসব আসতে বীরদর্পে চলে। প্রায় দেড় যুগ আগে রেলওয়ে পরিবহণ ও বাণিজ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের বিচারিক ক্ষমতা (ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার) ছিল, বর্তমানে তা নেই। এতে বিনাটিকিটি লোকজন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে।
রেলওয়ের দৈনন্দিন ট্রেন পরিচালনা-সংক্রান্ত তথ্য বলছে, নন স্টপ আন্তঃনগর তিনটি ট্রেনে প্রতি মাসে ২/১ দিন ছাড়া শতভাগ টিকিট বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু বাকি আন্তঃনগর ট্রেনগুলোতে কখনই শতভাগ টিকিট বিক্রি হয় না। রেলে সবচেয়ে বেশি আয় হয় এসি চেয়ার এবং এসি-নন এসি কেবিনগুলোর টিকিট বিক্রি থেকে। কিন্তু এসব ট্রেনে মাঝ পথে যত্রতত্র যাত্রা বিরতি থাকায় এসব আসনের অনেক ফাঁকা যাচ্ছে।
ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রায় সাড়ে ৩০০ অত্যাধুনিক কোচ আমদানি করা হয়েছে বর্তমান সরকারের আমলে। পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে দুটি নন স্টপ ট্রেন চালু করা হয়েছে। এছাড়া বর্তমান সরকারের আমলে ৫৩টি ট্রেন নতুন করে চালু করা হয়েছে। এসব ট্রেনে অতিরিক্ত যাত্রাবিরতি দেওয়ার কারণে যাত্রী সেবা লাটে উঠছে। বিনা টিকিটিদের পাল্লা ভারী করছে।
নতুন চালু হওয়া পঞ্চগড় এক্সপ্রেস এক্সপ্রেস উদ্বোধনের সময় ৩টি যাত্রা বিরতি ছিল, বর্তমানে এ ট্রেনটি ৯টি স্টেশনে যাত্রা বিরতি দিচ্ছে। বেনাপোল এক্সপ্রেস যাত্রা শুরুর পর এ পর্যন্ত আরও অতিরিক্ত তিনটি স্টেশনে যাত্রা বিরতি দিচ্ছে। কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস অতিরিক্ত আরও ৩টি স্টেশনে দাঁড়াচ্ছে। দ্রুতযান এক্সপ্রেস যাত্রার শুরুতে ৯টি স্টেশনে দাঁড়াতে-বর্তমানে এ ট্রেনটি ২৩টি স্টেশনে দাঁড়াচ্ছে।
পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেন যাত্রার পর অতিরিক্ত আরও ৩টি স্টেশনে দাঁড়াচ্ছে। নীলসাগর এক্সপ্রেস যাত্রার শুরুতে ৮টি স্টেশনে দাঁড়ালেও বর্তমানে ১৭টি স্টেশনে দঁাঁড়াচ্ছে। ঢাকা-সিলেট কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনটি যাত্রার শুরুতে নন স্টপ ছিল, বর্তমানে এ ট্রেনটি ১১টি স্টেশনে দাঁড়াচ্ছে। এছাড়া উপবন, তূর্ণানিশিতা, এগারসিন্ধুর, চিত্রা, একতা, মহানগর প্রভাতি, মহানগর গোধূলী, জয়ন্তিকা, পাহাড়িকা, ধূমকেতু যাত্রা শুরুর পর থেকে গড়ে অতিরিক্ত ৫ থেকে ১১টি স্টেশনে দাঁড়াচ্ছে।
ঢাকা সিলেট পারাবত, জয়ন্তিকা, উপবন এক্সপ্রেস দিনে ৬ বার চলাচল করত। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রেলমন্ত্রী হওয়ার পর এ পথে কালনী এক্সপ্রেস নামে একটি আন্তঃনগর ট্রেন চালু করেন। পূর্বের তিন জোড়া আন্তঃনগর ট্রেনেই পর্যাপ্ত ছিল না। পূর্বের ট্রেনগুলো অতিরিক্ত যাত্রা বিরতি ছিল। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক কারণে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনটি চালু করেন।
শুরুতে ১৪টি কোচ নিয়ে ট্রেনটি যাত্রা শুরু করে। যার মধ্যে ৭টি এসি বগি ছিল। পরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের মন্ত্রিত্ব যাওয়ার পর ট্রেনটি গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। এ ট্রেনের এসি বগিগুলোকে কেটে অন্যত্র ট্রেনে লাগানো হয়। পরবর্তীতে গত ৪ বছর পূর্বে ট্রেনটি শুধু মাত্র ৩টি কোচ নিয়ে চলাচল করেছে। বর্তমানে ট্রেনটির অবস্থা নাজুক।
ঢাকা-চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম-সিলেট ও চট্টগ্রাম-চাঁদপুর পথে আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রা বিরতি যত্রতত্র দেওয়া হয়েছে। শুধু কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় অন্তত ৯টি যাত্রা বিরতি দেওয়া হয়, গত ৪ বছরে। এতে করে এ পথে ট্রেনের যাত্রা দীর্ঘ হচ্ছে। ট্রেনের সময়সূচিও ঠিক থাকছে না। অন্যদিকে দূরপাল্লার যাত্রীরাও ভোগান্তিতে পড়ছেন।
মহানগর প্রভাতি আখাউড়ার পর পরবর্তী স্টেশন কসবায় যাত্রা বিরতি দেওয়া হয়েছে। চট্টলা এক্সপ্রেস গত ২ বছরে এ পথে অতিরিক্ত ৭টি স্টেশনে যাত্রা বিরতে দিচ্ছে। সিলেট চট্টগ্রাম রুটে চলা পাহাড়িকা এক্সপ্রেস গত ১০ বছরে অতিরিক্ত ৬টি স্টেশনে যাত্রা বিরতি দেওয়া হয়েছে।
ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত ট্রেন চালক, গার্ড ও প্রকৌশলীরা বলছেন, ৫০ থেকে ৬৫ কিলোমিটার গতিবেগে চলা আন্তঃনগর ট্রেন একটি বিরতিতে থামিয়ে আবার ওই গতিবেগে নিতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে। যত্রতত্র যাত্রা বিরতির কারণে এক একটি স্টেশনে ট্রেন থামানোর কারণে বিপরীত দিক আসা অন্য ট্রেনকে যেতে দেওয়ার জন্য যাত্রা বিরতি ছাড়াও ট্রেন দাঁড় করাতে হয়। এতে বিলম্বের ট্রেন আরও বিলল্বে গন্তেব্য পৌঁছে।
পরিবহণ দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে রেলওয়ে বাণিজ্যিক ও পরিবহণ দপ্তরে অন্তত ৪১টি ডিও লেটার রয়েছে। বিভিন্ন আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রা বিরতি দেওয়ার জন্য এসব ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যিক দপ্তর বলছে, ট্রেনের যাত্রাবিরতি বাড়ানো সঙ্গে জ্বালানি খরচ বাড়ে। গতি কমে, দুর্ঘটনাও বাড়ে। যাত্রা বাড়ালেও টিকিট বিক্রি হয় না, কিন্তু বিনা টিকিটি যাত্রীরা এক একটি ট্রেনের ভেতর উপচে পড়েন।
রেলপথ সচিব সেলিম রেজা জানান, প্রায় ডিও লেটারসহ ভিআইপিদের চিঠিপত্র পাচ্ছি। তারা বিভিন্ন স্টেশনে ট্রেনের যাত্রাবিরতি চাচ্ছেন। আমরা এসব চাহিদা অনুযায়ী অনেক হিসাব-নিকাশ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে ঘনঘন যাত্রাবিরতি দিলে ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়সহ যাত্রার সময় বেশি লাগছে।
সূত্র: যুগান্তর
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত