সেবায় স্বস্তি বিআরটিএতে, ড্রাইভিং লাইসেন্স এর ভোগান্তির অবসান

Passenger Voice    |    ১২:১০ পিএম, ২০২১-১০-১০


সেবায় স্বস্তি বিআরটিএতে, ড্রাইভিং লাইসেন্স এর ভোগান্তির অবসান

নিজস্ব প্রতিবেদক: সারাদেশে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএর ৫৭ সার্কেলে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত প্রিন্টের অপেক্ষায় ছিল সাড়ে ১২ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স। ছবি, আঙুলের ছাপ দেওয়া, নতুন আবেদনসহ এই ১২ লাখ ৪৫ হাজার গ্রাহক স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য গত প্রায় ৩ বছর ধরে বিআরটিএর কর্মকর্তাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন। কোন প্রতিষ্ঠান শতকোটি টাকার লাইসেন্স সরবরাহের কাজ পাবে, তা নিয়েই মূলত এই টানাপোড়েন হয়েছিল। দরপত্র বাতিল ও পুনরায় কার্যাদেশ প্রদান এবং রিভিউ আপিল ও হয়েছিল এগুলো নিয়ে। ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সালের আগষ্ট মাস পর্যন্ত বিআরটিএর ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে সবাইকে। ৫ থেকে ১০ বার বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট সার্কেল ঘুরেও সোনার হরিণ ড্রাইভিং লাইসেন্সের দেখা পায়নি কেউ। 

এর মধ্যে পরিবর্তন হয়েছে বিআরটিএর তিন জন চেয়ারম্যান।  বিআরটিএর সাবেক চেয়ারম্যান মশিউর রহমানকে ২০১৯ সালের অক্টোবরের দিকে ওএসডি করে বিআরটিএতে কাজের গতি ও গ্রাহক সেবার মান নিশ্চিত করতে তৎসময়ের সড়ক পরিবহন মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. কামরুল আহসানকে দায়িত্ব দেয় সরকার। তবে কোন কিছু ঘুছিয়ে নেওয়ার আগে ২০২০ সালের ২৯ মার্চ অবসরে যান তিনি। তখন বিআরটিএর পরিচালক প্রশাসন মো. ইউসুপ আলী মোল্লাকে চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত ভার দিয়ে একই বছরের ২২ জুন পর্যন্ত কার্যক্রম চালিয়ে নিয়েছিল সড়ক পরিবহন সেতু মন্ত্রণালয়। তখনও ড্রাইভিং লাইসেন্সের কোন গতি ফিরেনি। এরপর বিআরটিএ আবারও ভারমুক্ত চেয়ারম্যান পেলেন। নতুন দায়িত্বে আসলেন অতিরিক্ত সচিব নুর মোহাম্মদ মজুমদার। বিআরটিএতে যোগদানের পর থেকে নিয়েছিলেন ড্রাইভিং লাইসেন্স এর ভোগান্তি নিরসনে নতুন চ্যালেঞ্জ। অবশেষে সফল হয়েছেন তিনি। 

নানা জল্পনা কল্পনা শেষে আজ থেকে ২০১৯ সাল থেকে ঝুলে থাকা সাড়ে ১২ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রিন্ট শুরু হয়েছে বর্তমান চেয়ারম্যানের হাত ধরে।  দীর্ঘ ভোগান্তির অবসান কাটিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) গ্রাহকদের আস্থা ও স্বচ্ছতায় ফিরাতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। নানা আলোচনা-সমালোচনা, অনিয়ম, অভিযাগের পর আজ বাস্তবায়িত হচ্ছে ড্রাইভিং লাইসেন্স স্মার্ট কার্ড প্রদানের প্রক্রিয়া। প্রায় তিন বছর যাবত আটকে থাকা সোনার হরিণ নামক ড্রাইভিং লাইসেন্সের গ্লানি মুছবে আগামী ৬ মাসের মধ্যে। 

এই বিষয়ে রাত ৮ টার দিকে প্যাসেঞ্জার ভয়েসের সাথে আলাপকালে বিআরটিএর বর্তমান ও সফল চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, আমি বিআরটিএর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার সময় মাননীয় সড়ক পরিবহন সেতু মন্ত্রী মহোদয় আমাকে একটি চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন ২০১৯ সাল থেকে চলমান ড্রাইভিং লাইসেন্স এর ভোগান্তি আমাকে নিরসন করতে হবে। এবং নতুন ভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রক্রিয়া সাজাতে হবে। আমি যোগদানের পরে করোনার মহামারিতে অনেকটা সময় নষ্ট হলেও আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছি দেশের সাধারণ চালকরা যেন আর ভোগান্তিতে না থাকে। বর্তমানে ড্রাইভিং লাইসেন্স এর লিখিত পরীক্ষা অংশ গ্রহন করার পরে ৭-১৫ দিনের মধ্যে স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রাহকের হাতে তুলে দিচ্ছি। প্রায় ৩ বছরের মতো ঝুলে থাকা সাড়ে ১২ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্সও আজ থেকে প্রিন্ট করা শুরু হয়েছে। 

তিনি আরো বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকা ড্রাইভিং লাইসেন্স দ্রুত সময়ে প্রদান এবং গ্রাহক ভোগান্তি কমানোর জন্য সরাসরি ক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ) কে স্মার্ট কার্ড প্রস্তুতের কাজ দেয়া হয়েছে এবং ছাপার কাজও আজ ১১ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৮ হাজার করে কার্ড প্রিন্ট দিবে প্রতিষ্ঠানটি।  আগামী ছয় মাসের মধ্যে অপেক্ষায় থাকা ১২ লাখ ৪৫ হাজার গ্রাহকের হাতে স্মার্ট কার্ড তুলে দিতে পারবে এমন প্রত্যাশা বিআরটিএর চেয়ারম্যানের।

আরো পড়ুন: চলতি মাসেই আটকে থাকা স্মার্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স দেবে বিআরটিএ

নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে ২০২০ সালের ২৯ জুলাই নতুন করে দরপত্রের মাধ্যমে ভারতের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্সের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় বিআরটিএ। পাঁচ বছরে ৪০ লাখ লাইসেন্স দেবে এই মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয় প্রতিষ্ঠানটি। চলমান নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স স্মার্ট কার্ড প্রদানে কাজ করছে মাদ্রাজ সিকিউরিটি প্রিন্টার্স। ইতি মধ্যে তারা গ্রাহকে কার্ড সরবরাহ শুরু করেছে।

বিআরটিএ এর সূত্র মতে, শুধু ড্রাইভিং লাইসেন্স (স্মার্ট কার্ড) প্রদানের জটিলতা নিরসন নয়, বিআরটিএ বর্তমান চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিআরটিএ এর স্বচ্ছতা ফেরাতে গত দেড় বছরে নানা উদ্যোগের ফলে ইমেজ ফিরে পেয়েছে এই সংস্থাটি। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ, গৃহীত হয়েছে নতুন নতুন পরিকল্পনা। ফলে ঘুষ লেনদেন আর হয়রানি নিয়ে সব সময় আলোচনায় থাকা বিআরটিএ এখন ডিজিটাল সংস্থা। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সকল সেবাই এখন সহজে মিলছে অনলাইনে।

বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল (বিএসপি)'র অনলাইন সেবা প্রদানের মাধ্যম সহজেই এখন শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্স, স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স, ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন, ডুপ্লিকেট ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদি সেবার জন্য অনলাইনে আবেদন ও ফি প্রদান করা যায়।

এই অনলাইন সেবার ফলে জনভোগান্তি কমেছে বৃহদাংশে। জনমনে বিআরটিএ'র সেবা নিয়ে স্বস্তি ফিরেছে। এই কর্মকর্তার দায়িত্বভার গ্রহণের পর জনভোগান্তি কমাতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে অকল্পনীয় ও চমকপ্রদ পরিবর্তন এনেছেন।

আরো পড়ুন: অনলাইনেই মিলবে ড্রাইভিং লাইসেন্সের পুনঃপরীক্ষার তারিখ

সংস্থাটির তথ্য মতে, স্বশরীরে না এসেই যে কেউ বিএসপি পোর্টালের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট দিয়ে অনলাইনে ঘরে বসেই  শিক্ষানবিস ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে পারছেন। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফি প্রদান করার সুযোগ থাকায় ব্যাংকে যেতে হচ্ছে না। এই ডিজিটালাইজেশন ও ইনোভেশন কার্যক্রমের জন্য ‘জনপ্রশাসন পদক-২০২১’ পেয়েছে বিআরটিএ। এছাড়াও রাইডশেয়ারিং ও মোটরযানের এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেটের জন্য আবেদন এবং সার্টিফিকেট প্রাপ্তির মতো কাজগুলো এখন মানুষ ঘরে বসেই করতে পারছেন।

ঘরে বসেই অনলাইনের মাধ্যমে হাইসিকিউরিটি স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স ও মোটরযান রেজিস্ট্রেশনের আবেদনও করা যাচ্ছে। অপরদিকে রেজিস্ট্রেশন সনদের জন্য আঙুলের ছাপ দেয়া ও সার্টিফিকেট গ্রহণ, রেট্রো-রিফ্লেকটিভ নম্বরপ্লেট ও আরএফআইডি ট্যাগ সংযোজনের সময়সূচি এসএমএসের মাধ্যমে গ্রাহকদেরকে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসএমএসের মাধ্যমে ফিটনেস ও ট্যাক্স টোকেনের বৈধতার মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে প্রয়োজনীয় ফি সম্পর্কে অবহতি করা হয়। নাম্বারপ্লেট প্রদানের সময় যানের মালিক ও গাড়ির ছবি তুলে অনলাইনে রাখার ফলে দালালদের দৌরাত্ম্য নেই বললেই চলে। বিআরটিএর ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন করা লাইসেন্সের স্ট্যাটাস সম্পর্কে অবগত হওয়া , ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফি পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। ড্রাইভিং লাইসেন্স (ডিএল) চেকার অ্যাপ দিয়ে জানা যাচ্ছে ড্রাইভিং লাইসেন্সের সঠিকতা।

আরো পড়ুন: সাড়ে ১২ লাখ ড্রাইভিং লাইসেন্সের গ্লানি মুছবে ৬ মাসে

ইতিমধ্যে ঢাকা মেট্রো সার্কেল-১, ২, ৩ ও ঢাকা জেলা সার্কেল অফিসে যানের ফিটনেট সার্টিফিকেট নবায়নের জন্য এ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। ফলে মালিকরা সংশ্লিষ্ট সার্কেলে এসে অনায়াসে মোটরযান পরিদর্শন করে ফিটনেস সার্টিফিকেট গ্রহণ করতে পারছেন। বলাবাহুল্য বিআরটিএর প্রত্যেকটি কার্যক্রমে মনিটরিং বাড়ানো হয়েছে এবং অনিয়ম ঠেকাতে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে।

বর্তমানে বিআরটিএ এর ৭০ শতাংশ কাজ অনলাইনে প্রক্রিয়ায় আনা হয়েছে। দূর্নীতি দূর্নীতি ও অনিয়ম রোধে ড্রাইভিং লাইসেন্সের পরীক্ষার ফলাফল সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ করা হচ্ছে। মহাসড়কগুলোত গতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত স্পিড ও ছোট যান চলাচলে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ফিটনেস বিহীন গাড়ি ও রুট পরিবর্তন করা পরিবহনের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে, নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে, সেই সাথে করা হচ্ছে জরিমানা।

বিআরটিএ কে আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যে ডিজিটাল, টেকসই, নিরাপদ, সুশৃঙ্খল, পরিবেশবান্ধব আধুনিক সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নানা ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ ও সেটা বাস্তবায়নে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলরা। অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, যুগোপযোগী সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগে ভূমিকা রাখছে বিআরটিএ।