সময়মতো যন্ত্রাংশ না পেয়ে কমছে রেলের ইঞ্জিনের সক্ষমতা

Passenger Voice    |    ১০:৪৭ এএম, ২০২১-০৮-৩১


সময়মতো যন্ত্রাংশ না পেয়ে কমছে রেলের ইঞ্জিনের সক্ষমতা

ট্রেনের ইঞ্জিনের (লোকোমোটিভ) একটি যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে ১২টি ধাপ অনুসরণ করতে হয় বাংলাদেশ রেলওয়েকে। প্রথম ধাপে যন্ত্রাংশের চাহিদা নিরূপণ করতে হয়। এতে সময় লাগে ন্যূনতম চার সপ্তাহ। বিভিন্ন কাগজপত্র তৈরি করতে লেগে যায় আরো দুই সপ্তাহ। তৃতীয় ধাপে চলে দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি। সময় লাগে মোটামুটি চার সপ্তাহ। দরপত্র আহ্বান করতে গিয়ে ছয় সপ্তাহ চলে যায়। ১৬ সপ্তাহ সময় লাগে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে। আর দরদাতার সঙ্গে চুক্তি করতে সময় লাগে আট সপ্তাহ। এরপর এলসি খুলতে চলে যায় আরো দুই সপ্তাহ। বাংলাদেশে যন্ত্রাংশের চালান আসতে (শিপমেন্ট) ৩৬ সপ্তাহ সময় লাগে। দেশে পৌঁছানোর পর কাস্টমস ও বন্দর থেকে ছাড়পত্র পেতে এক সপ্তাহ চলে যায়।

যন্ত্রাংশের চালান রেলওয়ে গ্রহণ ও সেগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে অন্তত দুই সপ্তাহ যায়। সেখান থেকে রেলের ভাণ্ডারে পৌঁছতে সময় লাগে আরো দুই সপ্তাহ। আর সেখান থেকে সর্বশেষ ধাপে ইঞ্জিন পর্যন্ত যন্ত্রাংশ পৌঁছাতে দুই সপ্তাহের মতো সময় লাগে। সবমিলে সংগ্রহ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে ৮৫ সপ্তাহ। সম্প্রতি রেলভবনে অনুষ্ঠিত ‘লোকোমোটিভ রক্ষণাবেক্ষণ, লোকোমোটিভের স্পেয়ার যন্ত্রাংশের প্রাপ্যতা: সমস্যা ও সম্ভাব্য সমাধান’ শীর্ষক সভায় এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

প্রায় ২৫ হাজার ধরনের যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হয় ট্রেনের একটি ইঞ্জিনে (লোকোমোটিভ)। সবগুলোই আবার বিশেষায়িত ‘আইটেম’। এসব যন্ত্রাংশের মাত্র ৫ শতাংশ বাংলাদেশে উৎপাদন হয়। ৯৫ শতাংশ যন্ত্রাংশ বিভিন্ন বিদেশী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সংগ্রহ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। চাহিদা নিরূপণ থেকে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যন্ত্রাংশের একটি লট কিনতেই রেলওয়ের সময় লেগে যায় প্রায় দুই বছর। যন্ত্রাংশ সংগ্রহে এই ‘অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ’ ইঞ্জিনের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

ট্রেনের ইঞ্জিনের জন্য মানসম্মত যন্ত্রাংশ উৎপাদন করে বিশ্বের গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠান। এ কারণে আমদানি করা যন্ত্রাংশের দাম পড়ে বেশি। আবার বাংলাদেশ রেলওয়ে যে পরিমাণ যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে—উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে তা বেশ ‘ছোট আকারের’। ফলে বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে পণ্য বিক্রিতে বিদেশী উৎপাদকদের আগ্রহও কম বলে উল্লেখ করা হয়েছে সভায় উপস্থাপিত একটি প্রতিবেদনে। যন্ত্রাংশ সংগ্রহের জন্য রেলওয়ের দরপত্র আহ্বানে তথ্য বিশ্লেষণ করেও একই চিত্র পাওয়া গেছে।

রেলওয়েতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ে যন্ত্রাংশ আমদানির জন্য ৪ হাজার ৮৩০টি দরপত্র আহ্বান করে। উৎপাদকদের আগ্রহ কম থাকার কারণে আড়াই হাজারের বেশি দরপত্র গ্রহণ না হওয়ায় পুনরায় আহ্বান করেছে সংস্থাটি।

ইঞ্জিনের দুর্বল পারফরম্যান্স ও ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়া; ইঞ্জিনের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া; ইঞ্জিনের লাইফ সাইকেল কস্ট বৃদ্ধি; ট্রেনের সময়সূচিতে বিপর্যয়; মানবসম্পদের ভুল ব্যবহার; দীর্ঘ সময় ধরে মূলধন আটকে থাকা; এবং সর্বোপরি যাত্রী অসন্তোষের মতো বিষয়গুলো যন্ত্রাংশ সংগ্রহ প্রক্রিয়ার জটিলতার কারণে তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা।

রেলওয়ের যন্ত্রাংশের ক্ষেত্রে এসব জটিলতার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের। তিনি বলেন, রেলের সিংহভাগ ইঞ্জিন পুরনো। ফলে সেগুলো মেরামতের প্রয়োজন হয় বেশি। মেরামত করতে গিয়ে অনেক সময় দেখা যায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমাদের স্টোরে নেই। তখন বেশ সমস্যার মুখে পড়তে হয়। রেলের ৯৫ ভাগ যন্ত্রাংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় সেগুলো সংগ্রহ করতে অনেক বেশি সময় লাগে। খরচও হয় বেশি। এজন্য আমরা পরিকল্পনা করছি রেলওয়ের যন্ত্রাংশ দেশেই উৎপাদন করার। এজন্য একটি নীতিমালাও প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।