| মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | প্রিন্ট | ১৪ বার পঠিত | পড়ুন মিনিটে
বর্তমান বিএনপি সরকার ইউরোপের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব কীভাবে এগিয়ে নিতে চায়, এয়ারবাস থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টিকে তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চান ঢাকায় ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শারলে।
মঙ্গলবার ঢাকায় ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত ডিক্যাব টকে এক প্রশ্নে তিনি এ বিষয়ে কথা বলেন।
সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও দরকষাকষি চলমান থাকায় এয়ারবাস বিক্রি নিয়ে এখনও ‘চিন্তিত’ না হওয়ার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, “আমি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের উপর জোর দিচ্ছি এবং এটা এমন এক বার্তা, সেটা বর্তমান সরকারের কাছেও আমরা দিচ্ছি। কেননা, আমরা মনে করি এটা অত্যাবশ্যকীয়।
“আমি মনে করি এটা বর্তমান সরকারের জন্য ভালো পরীক্ষা এবং এই সরকার এবং বিমানের প্রতি আমাদের আত্মবিশ্বাস আছে।”
এয়ারবাস বিক্রিকে ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে তুলে ধরে তিনি বলেন, “এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কেন এটা ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ? অবশ্য ১০টি উড়োজাহাজ বড় চুক্তি না, কিন্তু এটা আমাদের কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু। বেসামরিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে ইউরোপীয়দের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বে যাওয়ার জন্য আলোচনায় যুক্ত হতে বাংলাদেশ ইচ্ছুক। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
“আমরা অংশীদারত্বে বিশ্বাস করি। আপনি একটি চুক্তি করবেন এবং আর সরে পড়বেন, এমনটাতে আমরা বিশ্বাস করি না, এভাবে আমরা কাজও করি না। আমরা সত্যিকারের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়তে চাই, যেভাবে অনেক ফরাসি কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের অংশীদারত্ব রয়েছে।”
এমন দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব সামনের দিনে এগিয়ে নিতে আগ্রহী হওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “এটা এমন না যে, শুধু এয়ারবাস বিক্রি করলাম, এরপর শেষ; এটি আসলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীরদারত্বে যুক্ত হওয়া।”
ইউরোপকে বাংলাদেশের প্রধান অংশীদার হিসাবে বর্ণনা করে রাষ্ট্রদূত বলেন, আমেরিকায় ১৭ শতাংশের বিপরীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ৪৮ শতাংশ যায় ইউরোপে। এটা তিন অনুপাত এক। যুক্তরাজ্যকে অন্তর্ভুক্ত করলে এটা আরও বেশি।
“সুতরাং ইউরোপ হচ্ছে প্রধান অংশীদার। যখন আমরা বাংলাদেশি বন্ধুদের সাথে আলাপ করি, তখন কেবল একটা বিষয়ই স্মরণ করিয়ে দিই যে, আমাদের অভিন্ন স্বার্থ হচ্ছে অংশীদারত্বের গড়ে তোলা। কেননা, আপনার নির্ভরযোগ্য, প্রাসঙ্গিক ও আগ্রহী অংশীদার রয়েছে, যে আপনার সঙ্গে সহযোগিতা করতে চায়।”
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই বিমানের জন্য উড়োজাহাজ কেনার কথা চলছিল। বিলিয়ন ডলারের এই ব্যবসা মার্কিন জায়ান্ট বোয়িং না ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাস–কার পাতে যাবে, তা নিয়ে তখন থেকেই একটা টানাহেঁচড়া চলছিল।
আওয়ামী লীগ সরকার শেষ দিকে এসে এয়ারবাসের পক্ষে ঝুঁকেছিল, এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার কথা জানিয়েছিলেন তখনকার বিমানমন্ত্রী মাহাবুব আলী।
তবে ৫ অগাস্টের পালাবদলের পর পাশার দান উল্টে যায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত দেয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও সিয়াটলের পথেই হেঁটেছে। দায়িত্ব নেওয়ার দুই মাসের মাথায় বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি এয়ারক্রাফট কেনার চুক্তি করে সরকার।
তবে সেই চুক্তির পরেও এয়ারবাসের কর্মকর্তারা দৃশ্যত হাল ছেড়ে দেননি। এয়ারবাসের কর্মকর্তারা সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দৌড়ঝাঁপ অব্যাহত রেখেছেন।
সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরাও যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। জুন মাসেই জানা গিয়েছিল এয়ারবাস কিনতে সরকার ‘ইতিবাচক’।
এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনা চলার মধ্যে বোয়িং থেকে আরও ১১টি উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়েছে বিএনপি সরকার। বুধবার নিউ ইয়র্কে বোয়িংয়ের সঙ্গে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এ বিষয়ে চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে।
এয়ারবাসের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আলোচনার সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, তা তুলে ধরে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বলেন, মিশ্র বহরের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ভালো ‘কারিগরি কারণে’ বিমান বাংলাদেশ এয়ারবাসকে বেছে নিয়েছিল, ‘রাজনৈতিক কারণে নয়’।
“বিশ্বের বহু বিমান সংস্থা এয়ারবাসকে গ্রহণ করেছে, বিমানের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়।”
এয়ারবাসের সঙ্গে আলোচনার মধ্যে আমেরিকান কোম্পানি বোয়িং থেকে বিমানের উড়োজাহাজ কেনার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত বলেন, এয়ারবাসের সঙ্গেও আগ্রহ বজায় রেখেছে বিমান এবং আলোচনা ও দরকষাকষি এখনও চলমান।
“সুতরাং এতে সময় লাগতে পারে, তবে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি দরকষাকষি এখনও ভালোভাবে চলছে এবং ভালো ফলও আসছে।”
আগামী বছর ইউরোপের সঙ্গে চালু হতে যাওয়া মু্ক্ত বাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) দরকষাকষির সঙ্গেও এয়ারবাস কেনাকে আরেক প্রশ্নে মিলিয়েছেন রাষ্ট্রদূত।
ঢাকায় ওই ২৭টির দেশের মধ্যে কেবল সাতটির দূতাবাস থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ভারত, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার সঙ্গে এফটিএ করেছে ইউরোপ ইউনিয়ন, কিন্তু সেই মানচিত্রে বাংলাদেশ নেই বা যথেষ্ট পরিমাণে নেই।
“সুতরাং আপনি যদি ওই মানচিত্রে আরও বেশি পরিমাপে থাকতে চান, তাহলে আপনাকে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের আগ্রহ নিয়ে আলোচনায় যুক্ত হতে হবে। সেই বিবেচনায় এয়ারবাস গুরুত্ব বহন করে। কেননা, এটা ইউরোপকে কেবল একটা বিকল্প হিসাবে হিসাবে বেছে নেওয়ার ইচ্ছা নয়, বরং সহযোগী হিসাবে বেছে নেওয়া যে, ‘আমরা ইউরোপে যাচ্ছি, আমরা জানি আপনারা আমাদের শ্রদ্ধা করবেন, আমাদের আপনাদের সঙ্গে স্বার্থ আছে’।”
রাষ্ট্রদূত বলেন, “ফ্রান্স এবং ইউরোপ কখনও বলে না, ‘আমাদের’ এবং ‘তাদের’ মধ্য থেকে একজনকে বেছে নাও, ‘তাদের’ বলতে যারাই হোক না কেন। আমি শুরুতে যেভাবে বলেছি, আমরা অংশীদারত্বে বিশ্বাস করি। অংশীদারত্ব মানে বাদ দেওয়া নয়, অন্তর্ভুক্তি।
“আপনি যদি না চান, আপনার যদি মনে হয় এফটিএ নিয়ে আগানো ভালো কিছু হবে না, এটা আপনার সিদ্ধান্ত। হয়ত, ইউরোপীয় দেশগুলোও সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে, তারা এফটিএ চায় না, এটা তাদের সিদ্ধান্ত। সুতরাং ঢাকা ইউরোপ কী বার্তা পাঠাচ্ছে, সেটা গুরুত্ব বহন করে।”
এফটিএ হলে ইউরোপের ২৭টি দেশে বাংলাদেশের জন্য বাণিজ্যের পরিসর বড় হওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা তুলে ধরেন রাষ্ট্রদূত।