শিরোনাম
Passenger Voice | ১১:৩৯ এএম, ২০২৫-০৯-০৩
হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বাল্লা স্থলবন্দরের কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। ৪৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক স্থাপনাটি এখন অব্যবহৃত পড়ে আছে। সরকারি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিশাল অবকাঠামো ইতোমধ্যে ছাগলের চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৬ সালের ২৩ মার্চ বাল্লা স্থলবন্দরের নির্মাণকাজ শুরু হয়। এ জন্য অধিগ্রহণ করা হয় প্রায় ১৩ একর জমি। ২০২৩ সালের জুনে নির্মাণ শেষ হয়। এখানে ওয়্যারহাউজ, ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড, ট্রাক পার্কিং, প্রশাসনিক ভবন ও ডরমিটরিসহ সব আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। কিন্তু কার্যক্রম শুরুর আগেই গত ২৮ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের উপদেষ্টা পরিষদের ৪০তম বৈঠকে এ বন্দরের অপারেশন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত অনুমোদন হয়।
বৈঠকে প্রধান কারণ হিসেবে উঠে আসে সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরার পাহাড়মুড়া এলাকায় কোনো স্থলবন্দর না থাকা। শুরু থেকেই এর কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় থাকলেও প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়।
স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বন্দরে যে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তারা বসে বসে বেতন নিচ্ছেন। কার্যক্রম চালু না হলেও স্টাফ বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণ মিলিয়ে প্রতিমাসে ১০ লাখ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। যে কারণে বন্দরের কার্যক্রম স্থগিত করেছে সরকার।’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বন্দর এলাকা এখন মানুষের ঘুরতে আসার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে ছবি তুলতে আসেন। কিন্তু সরকারি কাজে ব্যবহার হচ্ছে না একটি ভবনও। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনের দেয়ালে মরিচা ধরছে, যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবাধে ছাগল চরে বেড়াচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আজিজ মিয়া বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম বন্দর চালু হলে ভারতীয় বাজারের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্য করতে পারব। কর্মসংস্থান হবে অসংখ্য মানুষের। কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সব স্বপ্ন ভেঙে গেছে।’
আরেক ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো এখন ছাগলের চারণভূমি। অথচ এই বন্দর চালু হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। আমাদের অনুরোধ থাকবে, বন্দরটি এভাবে বাতিল না করে ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত চালুর ব্যবস্থা করা।’
চুনারুঘাট উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মীর সিরাজ বলেন, ‘লোক দেখানো উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা নষ্ট করেছে সরকার। ভারত সরকারের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়াই এই বন্দরটি নির্মাণ করা হয়েছে। যে কারণে এখন এটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।’
চুনারুঘাট উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘বন্দরটিকে ঘিরে আমাদের অনেক স্বপ্ন ছিল। কারণ এটি চালু হলে এই এলাকার অর্থনৈতিক অবস্থা বদলে যেত। হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হতো। কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বন্দর এখন অরক্ষিত। রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা না নিলে শিগগিরই দখল হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।’
স্থলবন্দর নির্মাণের সময় শতাধিক পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তাদের অনেকেই ক্ষতিপূরণের টাকা পাননি। এখনো প্রায় ১৩টি পরিবার বন্দর এলাকার ভেতরে বসবাস করছে।
টেকেরঘাট গ্রামের ইদ্রিস আলী বলেন, ‘আমার ৫ শতক জমি বন্দরের ভেতরে গেছে। ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হলেও আমি এক টাকাও পাইনি। জমিও গেল, বন্দরের সুবিধাও পেলাম না। এখন কী হবে!’
চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি সদ্য যোগদান করেছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেটা ভালো মনে করেছে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বন্দর যাতে বেদখল না হয়, সে জন্য দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সীমান্তবর্তী দেশের সঙ্গে সুস্পষ্ট সমঝোতা না হলে প্রকল্প শুধু জনদুর্ভোগই বাড়াবে। কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ না থাকলে তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতি। বাল্লা স্থলবন্দর সেই ব্যর্থতার অন্যতম উদাহরণ।
স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘ সময় অব্যবহৃত পড়ে থাকলে স্থাপনাগুলো দ্রুত নষ্ট হয়ে যাবে। এতে শুধু সরকারই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্থানীয় জনগণও। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এ উদ্যোগকে কার্যকরী করতে হলে দ্রুত ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা জরুরি।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত