শিরোনাম
চালক-হেলপারের আলাদা পোষাক
Passenger Voice | ০৬:১৭ পিএম, ২০২৫-০৮-২৩
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) নারায়নগঞ্জ জেলা সার্কেল ও জেলা প্রশাসন বাস চালক ও হেলাপারদের জন্য এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন। এই জেলায় চলাচলরত বাস চালক ও সহকারীদের জন্য আলাদা পোষাকের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তাঁরা।
একই সাথে নারায়নগঞ্জ জেলার সকল চালকদের নিয়ে বিআরটিএ একটি আলাদা ডাটাবেজ তৈরি করা ও চালকদের চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার সব বাস ও ট্রাক চালকদের নিয়োগপত্র দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন।
নারায়নগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, “আমরা পরিবহন শ্রমিকদের সম্মান বাড়াতে চাই। ওনারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন, দেশের ১৮ কোটি মানুষকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিরাপদে নিয়ে যাচ্ছেন, তাদের জীবনপ্রবাহ ঠিক রাখছেন এত চ্যালেঞ্জের মধ্যেও। রাস্তা ভাঙ্গা, প্রচন্ড যানজট এই সমস্যাগুলো মোকাবিলা করে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছেন। আমরা তাই পরিবহন শ্রমিকদের সেই সম্মানের জায়গায় তুলে ধরতে চাই। আমরা চালক ও হেলপারদের নিয়ে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ করছি। এগুলো বাস্তবায়িত হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমে যাবে।”
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের আয়োজিত 'গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন নারায়ণগঞ্জ' কর্মসূচির আওতায় 'গ্রিন আমব্রেলা'র উদ্যোগে মালিক ও চালকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে জেলা পরিষদ অডিটরিয়ামে ‘পেশাদার গাড়ী চালকদের প্রশিক্ষণ, বিশেষ ইউনিফর্ম, নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র প্রদান কর্মসূচি’ অনুষ্ঠিত হয়। গত ২০ আগস্ট বুধবার নারায়নগঞ্জ জেলা পরিষদ মিলনায়তনে বিআরটিএর মোটরযান পরিদর্শক মোঃ সাইফুল কবির এর সঞ্চালনায় কর্মসূচির উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
কর্মসূচির আওতায় গাড়ীচালক ও হেলপারদের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ তৈরি, পেশাদারিত্ব বৃদ্ধির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান, নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম সরবরাহ, নিয়োগপত্র ও আইডি কার্ড প্রদান করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ৫টি কোম্পানির ২১৬ জন চালক ও ৭৬ জন হেলপারের ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে।
এই সময় উপস্থিত ছিলেন, বিআরটিএর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) মো. মাহবুবুর রহমান, সিভিল সার্জন ডাঃ আবুল ফজল মুহাম্মদ মুশিউর রহমান, মোটরযান পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম ও সাইফুল কবীর, নারায়ণগঞ্জ বাস মালিক সমিতির সভাপতি মো. রওশন আলী সরকার, নারায়ণগঞ্জ পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. সেলিম প্রমুখ।
চালকের আলাদা পোষাকঃ দেশে প্রথমবারের মতো নারায়ণগঞ্জ জেলার সব বাস ও ট্রাক চালক ও সহকারীদের জন্য জেলা প্রশাসনের ফান্ড থেকে আলাদা আলাদা কালারের পোষাক দেয়া হচ্ছে। এই পোষাক পরিধানের কারনে কোন চালকের আসনে সহকারী বসতে পারবে না। তখন সাধারণ যাত্রীরা নিরাপদ-নিবিঘ্নে যাত্রী সেবা পাবে ও প্রশাসনের জন্য আইন প্রয়োগ করতে সহজ হবে। প্রথম ধাপে ৫৬ জন চালকের পোষাকের মাপ নিয়েছে জেলা প্রশাসন।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারায়নগঞ্জ জেলা প্রশাসনের এই উদ্যোগটি অত্যন্ত চমৎকার। তবে সড়ক দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে যাত্রী,পথচারী ও উৎসুক জনতা আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করে। অধিকাংশ সময়ে চালক ও হেলপাররা গণপিটুনির শিকার হয়। চালক এবং হেলপারের নির্দিষ্ট পোশাক থাকলে এই ধরনের অপরাধ বাড়তে পারে। যা চালক ও সহকারীদের জীবননাশের কারণ হতে পারে। তবে চালক শ্রমিকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি যাত্রী, পথচারী ও স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থীদের এই বিষয়ে সচেতন করার লক্ষ্যে বিভিন্ন সেমিনার, পথনাট্য ও সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করতে হবে। এছাড়াও প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারণা করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে যাত্রী, পথচারী ও উৎসুক জনতা কর্তৃক আইন হাতে তুলে নিলে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এইসব বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হলে নারায়নগঞ্জ জেলা প্রশাসকের গৃহিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব।
ডাটাবেজ তৈরিঃ দুর্ঘটনার পরে দায়ী চালকদের দ্রুত শনাক্ত করতে ড্রাইভারদের জন্য আলাদা ডাটাবেজ তৈরি করছে বিআরটিএ ও নারায়নগঞ্জ জেলা প্রশাসন। তবে এই ধরণের চালকদের ডাটাবেজ করতে গিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও বারবার হোঁচট খেয়েছে প্রশাসন।
সিএনজি ট্যাক্সি অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে, মিটারে চলছে না, চালক মালিকদের পরিচয়পত্র ঝুলানো থাকে না এ অভিযোগগুলোর সবকটিই সত্য। ফলে ২০০৭ সালে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ চট্টগ্রাম নগরীতে চলাচলরত ১৩ হাজার সিএনজি ট্যাক্সি চালক ও মালিকের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে ডাটাবেজ তৈরির কাজ শুরু করেছিল। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা ছিল এর ফলে একদিকে যাত্রী হয়রানি বন্ধ হবে, অন্য দিকে সিএনজি ট্যাক্সি চুরি এবং সে ট্যাক্সি ব্যবহার করে ছিনতাই রোধ হবে। কিন্তু একাধিকবার সময় বাড়িয়েও সবকটি ট্যাক্সিকে ডাটাবেজের আওতায় আনা যায়নি। দ্বিতীয় বার ২০১৪ সালে আবারও উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয় সিএমপি। পরবর্তীতে ২০২১ সালে কিছুটা সফল হলেও কার্যকর নেই বর্তমানে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চট্টগ্রামের মতো নারায়নগঞ্জ জেলাও সুপরিকল্পিত ভাবে ডাটাবেজ করে তদারকি না করলে সিএমপির মতো হোঁচট খাবে।
সূত্র আরো বলছে, সারাদেশে চালকদের নির্দিষ্ট কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ নেই, তবে পুলিশ অতীতে চালক ও মালিকদের ডাটাবেজ তৈরি করার উদ্যোগ নিয়েছিল, যা শহরের নিরাপত্তা ও ছিনতাই প্রতিরোধে সহায়ক হতো। এছাড়া, বিটাক (বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র) প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ড্রাইভারদের জন্য অবকাঠামো রয়েছে, তবে এটি চালকদের ডাটাবেজ নয়।
চালকের নিয়োগপত্রঃ ২০১৯ সালের ২৬ নভেম্বর মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হয়ে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের নিয়োগপত্রের বিধান কার্যকরের প্রতিশ্রুতি দেয় কমিটির সভাপতি সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু। বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আইনেই নিয়োগপত্র দেওয়ার কথা রয়েছে, পরিবহনের রুট পারমিটের জন্য আবেদনের সাথে চালকের নিয়োগপত্র যুক্ত করতে হয়। কিন্তু মালিক ও শ্রমিক দুই পক্ষেরই অনীহার কারণে এটার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এ বিষয়ে দুই পক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া পর বিধানটি বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা কমিটির পক্ষ থেকে শ্রম বিভাগকে নিবিড়ভাবে তদারকি করতে বলা হয়েছিল। ”
“দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো সমস্যায় দায় এড়াতেই মালিকরা নিয়োগপত্র দিতে চায় না বলে শ্রমিক পক্ষের অভিযোগ সব সময়। মালিকদের দাবী শ্রমিকরা ঘন ঘন প্রতিষ্ঠান/পরিবহন পরিবর্তন করেন বলে তারাই নিয়োগপত্র নিতে চান না।”
গত ২৬ জুন নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস ও সড়কে শৃঙ্খলা আনতে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম চালকদের নিয়োগপত্র প্রদানসহ তাঁর এক গুচ্ছ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জেলার পরিবহন ব্যবস্থারও পরিবর্তন আনতে হবে। যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা নিরাপদ করতে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান জেলা প্রশাসক।
নারায়ণগঞ্জ জেলা দেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক এলাকা এবং আন্তঃজেলা পরিবহনের গুরুত্বর্পূণ কেন্দ্র। প্রতিদিন লাখ লাখ যাত্রী এই জেলার উপর দিয়ে যাতায়াত করেন। গত ঈদুল আজহার সময়ে অতীতের চেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং প্রাণহানীও বেশি হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটেই সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে এই উদ্যোগ জেলা প্রশাসনের।
ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং অবৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সই সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারন উল্লেখ করে জাহিদুল ইসলাম বলেন, বেশিরভাগ দুর্ঘটনার পরে অপরাধী শনাক্তে চালকদের পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বেকায়দায় পড়তে হয়। এই জন্য জেলার সব ড্রাইভারদের তথ্যভিত্তিক ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গণপরিবহনের ড্রাইভার নিয়োগের সময় ড্রাইভিং লাইসেন্স, ড্রাইভারের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা এবং মাদকাসক্তি পরীক্ষাও দরকার।
তিনি মালিকদের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, আপনার মহা মূল্যবান গাড়িটির নিরাপত্তার জন্য হলেও নিয়োগপত্র দরকার। এ ছাড়া একজন ড্রাইভারের সামাজিক মর্যাদাও বাড়বে নিয়োগপত্র থাকলে। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা চালকদের ক্লান্তি ও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, চালকদের নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা দরকার। চালকের অনুপস্থিতির সুযোগে হেল্পারদের দিয়ে গাড়ি চালানো বন্ধে আইন প্রয়োগ, চালক ও হেল্পারদের জন্য পৃথক পোশাক ও পরিচয়পত্র চালু করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি রওশন আলী বলেন, গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন কর্মসূচির আওতায় চালকদের ইউনিফর্ম প্রদান একটি সম্পূর্ণ নতুন ও ঐতিহাসিক উদ্যোগ, যা ডিসি মহোদয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম নারায়ণগঞ্জে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা বাস মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের জয়েন্ট সেক্রেটারি মো. বিল্লাল হোসেন বলেন, জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে আমাদের পরিবহন শ্রমিকরা নিয়োগপত্র ও পরিচয়পত্র পাচ্ছেন। এর ফলে মালিকরা সামান্য কারণে পরিবহন শ্রমিকদের চাকুরিচ্যুত করতে পারবে না। এবং বছরে দুটি বোনাস পাবে মালিকদের কাছ থেকে। তিনি প্রতি বছর চালকদের কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরস্কার প্রবর্তনের আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথি সিভিল সার্জন ডা. এ এফ এম মুশিউর রহমান বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ জেলা প্রশাসক তার নিয়মিত কাজের গন্ডির বাইরে গিয়ে শুধুমাত্র জনগণের কল্যাণে বাস্তবায়ন করছেন।
অনুষ্ঠানের সভাপতি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, “এই কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা রোধের পাশাপাশি চালকদের কাজের স্বীকৃতি ও সম্মান বৃদ্ধি পাবে। সড়কে দুর্ঘটনা রোধের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ জেলা প্রশাসক মহোদয়ের স্বপ্ন ছিল, যা আজ তারই হাত ধরে নারায়ণগঞ্জে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে।”
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত 2019 - 2026 PassengerVoice | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Developed By Muktodhara Technology Limited.
পাবলিক মতামত