পদ্মামুখী টোলের ভার, নাকাল জনগণ!

Passenger Voice    |    ০৩:৫৪ পিএম, ২০২২-০৭-০৪


পদ্মামুখী টোলের ভার, নাকাল জনগণ!

টোলের ভারের কবলে পদ্মা সেতু হয়ে চলাচলকরা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলমুখী যানবাহন। ঢাকা আসতে পদ্মা সেতুসহ অন্তত তিন জায়গায় টোল দিতে হচ্ছে। এ কারণে বাড়ছে যাত্রী ও পণ্যবাহী যানবাহনের ভাড়া। বৃদ্ধি পাচ্ছে পণ্যের দামও। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যাত্রী, পরিবহন সংশ্লিষ্টসহ পণ্য আমদানিতে জড়িত লোকজন। তারা বলছেন, রাজধানীতে আসতে প্রথমে পদ্মা সেতু, তারপর মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়েসহ মেয়র হানিফ উড়াল সড়কে টোল দিতে হচ্ছে। গত এক জুলাই থেকে পোস্তগোলা, ধলেশ্বরী ও আড়িয়াল খাঁ সেতুতেও টোল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। পদ্মা সেতু ও এক্সপ্রেসওয়েতে টোল কমানোর দাবি উঠেছে কমবেশি সব মহল থেকেই।

জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, বহুল কাক্সিক্ষত পদ্মা সেতু উদ্বোধন হওয়ায় দক্ষিণের মানুষের যাতায়াতে রাস্তা অনেক কমেছে। কিন্তু বেশি টোলের কারণে বাসভাড়া বেড়েছে। তেমনি পণ্যবাহী পরিরবহনের ব্যয়ও হচ্ছে বেশি।

যাত্রী অধিকার আদায়ে কাজ করা সংগঠন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বারবার টোলের কারণে পদ্মা সেতুগামী যানবাহনের ভাড়া যেমন বেড়েছে তেমনি পণ্যর ভাড়াও বাড়বে। ফেরির ভাড়ার সঙ্গে সেতুর টোল নির্ধারণের বিসয়টি সমন্বয় করার দরকার ছিল। সেইসঙ্গে অন্যান্য সেতুর টোল কমানো বা বাতিল করা যেতে পারে। এক্সপ্রেসওয়ের টোল কমানোরও পরামর্শ দেন তিনি।

পদ্মা সেতুর টোল : সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মোটরসাইকেলের টোল নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ টাকা, আর বড় বাসের টোল নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার ৪০০ টাকা। গত (১৭ মে) সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ এই প্রজ্ঞাপন জারি করে। মোটরসাইকেল এবং বড় বাস ছাড়াও মাঝারি ধরনের বাসের টোল নির্ধারণ করা হয়েছে ২ হাজার টাকা, কার ও জিপের ৭৫০ টাকা, চার এক্সেল টেইলারের ৬ হাজার টাকা, মাইক্রো বাস ১ হাজার ৩০০ টাকা এবং মিনিবাসের (৩১ সিট বা তার কম) টোল নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৪০০ টাকা।

এক্সপ্রেসওয়ের টোল : পদ্মা পাড়ি দিয়েই যানবাহন গুলোতে ঢাকা-মাওয়া -ভাঙা এক্সপ্রেসওয়েতে টোলের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ৫৫ কিলোমিটারের এই সড়কে প্রথমবারের মতো গত এক জুলাই থেকে টোল হার নির্ধারণ করা হয়েছে। সড়কে নির্ধারিত টোল হল, ট্রেইলার ১ হাজার ৬৯০ টাকা, হেভি ট্রাক ১ হাজার ১০০ টাকা, মিডিয়াম ট্রাক ৫৫০ টাকা, বড় বাস ৪৯৫ টাকা, মিনি ট্রাক ৪১৫ টাকা, মিনিবাস ২৭৫ টাকা, মাইক্রোবাস ২২০ টাকা, ফোর হুইলচালিত যানবাহন ২২০ টাকা, সিডান কার ১৪০ টাকা, মোটরসাইকেলে ৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

উপ-সচিব ফাহমিদা হক জানান, ধোলাইপাড় থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত মোট ছয়টি টোল বুথ থাকবে। মাওয়া প্রান্তে আবদুল্লাহপুর, ধলেশ্বরী, শ্রীনগর পর্যন্ত তিনটি এবং পদ্মা সেতু পার হয়ে, কুলিয়াবাজার, মালিগ্রাম ও ভাঙ্গা পর্যন্ত আরো তিনটি টোল বুথ থাকবে। একটি বুথ দিয়ে ঢুকলে সেই গাড়িকে কমপক্ষে পরবর্তী টোল বুথ পর্যন্ত টাকা দিতে হবে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহাসড়কের (এন-৮ এক্সপ্রেসওয়ে) অন্তর্বর্তীকালীন সময়ের জন্য অনুমোদিত যানবাহনের শ্রেণি এবং টোল হার নির্ধারণ করা হলো।

পদ্মা সেতু হয়ে ১৩ রুটের বাসভাড়া বাড়ল : ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৩ রুটের বাসভাড়া বাড়িয়েছে সরকার। এ নিয়ে তিনদফা বাড়ল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাসের ভাড়া। সংস্থাটির পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) শীতাংশু শেখর বিশ্বাস স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে ১৫টি রুটের ভাড়া পুনর্র্নিধারণ করা হয়েছে। এবার ৪০ ও ৫১ আসনবিশিষ্ট দুই ধরনের বাসের ভাড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। বর্ধিত ভাড়া আজ থেকে কার্যকর হবে।

এর আগে গত ৭ জুন রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৩টি রুটে চলাচল করা বাস ভাড়া চূড়ান্ত করেছিল বিআরটিএ। এরপর ২০ জুন হালনাগাদ দূরত্বের ভিত্তিতে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হয়। এ নিয়ে তিনবার একই রুটের ভাড়া বিন্যাস করা হলো।

ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে মাওয়া, ভাঙ্গা, মাদারীপুর হয়ে বরিশালের দূরত্ব ১৫৬ কিলোমিটার। ভাড়া ৪৫৪ টাকা। এর আগে সায়েদাবাদ থেকে বরিশালের ভাড়া যথাক্রমে ৪১২ ও ৪২১ টাকা ধরা হয়েছিল। পুনর্নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা-গোপালগঞ্জের ভাড়া ৪২৩ টাকা। যা আগে ধরা হয়েছিল ৩৯২ টাকা। এছাড়া নতুন তালিকায় ঢাকা থেকে খুলনার ভাড়া ৫৩৭ থেকে ৫৭৫ টাকা হয়েছে। ঢাকা-শরীয়তপুরের ভাড়া ২২৬ থেকে বেড়ে ২৫৭ টাকা হয়েছে।

এদিকে পুনর্নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা অনুযায়ী, ঢাকা-পিরোজপুর ৫৮০, বাগেরহাট হয়ে ঢাকা-পিরোজপুর ৬১৯, ঢাকা-পটুয়াখালী ৫৬১, ঢাকা-মাদারীপুর ৩৪৪, ঢাকা-সাতক্ষীরা ৬৮৯, ঢাকা-ফরিদপুর ৩২৩, বাবুবাজার সেতু হয়ে শরীয়তপুর ২৫৭, ঢাকা-কুয়াকাটা ৭৬৭, কক্সবাজার থেকে বরিশাল ১ হাজার ৩৮৮, চট্টগ্রাম-খুলনা ১ হাজার ১৯২ এবং চট্টগ্রাম-বরগুনা ১ হাজার ২৮২ টাকা করা হয়েছে। বিআরটিএর প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, এ বাস ভাড়ার সঙ্গে মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের ভাড়া সংযুক্ত করা হয়নি। এ ফ্লাইওভার ব্যবহারকারী ৫১ আসনের বাসে যাত্রীপ্রতি ৬ টাকা ৭২ পয়সা ও ৪০ আসনের বাসে যাত্রীপ্রতি ৯ টাকা ভাড়া দিতে হবে।

ঢাকা থেকেই টোল শুরু : মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়ালসড়ক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিজস্ব সম্পত্তি বা আওতাধীন। এই উড়ালসড়ক থেকে টোল আদায় করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওরিয়ন গ্রুপ। গত বুধবার ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল কাজী মাঈনুল হাসান বলেন, টেন্ডারের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরও পোস্তগোলা ব্রিজ থেকে টোল আদায় করা হচ্ছিল। এ কারণে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে টোল আদায় বন্ধে হাইকোর্টে আবেদন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সড়ক ও জনপথ বিভাগ থেকে জানিয়েছে ১ জুলাই থেকে পোস্তগোলা ব্রিজের, আড়িয়াল খাঁ ব্রিজ ও ধলেশ্বরী ব্রিজের জন্য আলাদা করে টোল দিতে হবে না। শুধু এক্সপ্রেস হাইওয়ের জন্য টোল দিতে হবে।

এরপর পোস্তগোলা-ধলেশ্বরী-আড়িয়াল খাঁ সেতুতে পৃথকভাবে আর টোল দিতে হবে না বলে জানিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ)। শুধু ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেস হাইওয়ে ব্যবহার করলে সেজন্য টোল দিতে হবে। গত বুধবার গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন সওজ ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন।

প্রকৌশলী সবুজ উদ্দিন বলেন, ম্যানুয়ালি টোল আদায়ের কারণে সবসময় টোলপ্লাজায় গেটে জটলা লেগে থাকতো পোস্তগোলা ব্রিজে। এখন নতুন করে এক্সপ্রেসওয়ের টোল নেয়া হচ্ছে। এ কারণে এ রুটের অন্যান্য সেতুতে আর টোল থাকবে না।

সবুজ উদ্দিন আরো বলেন, ১ জুলাই থেকে পোস্তগোলা, ধলেশ্বরী ও আড়িয়াল খাঁ সেতুতেও টোল দিতে হবে না। শুধু ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ে টোল দিতে হবে। এ ৫৫ কিলোমিটার সড়কে চলাচলের জন্য ট্রাকে সাড়ে পাঁচশ’, প্রাইভেটকারে ১৩৭ টাকা ও বাসের জন্য ৪৯৫ টাকা নেবে সড়ক বিভাগ।

নৌ-সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, যাত্রীর সাধ্যের কথা বিবেচনায় নিয়ে টোল নির্ধারণ করলে ভালো হয়। কারণ টোলের কারণে বাস ভাড়া বা পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব মানুষের ওপর পড়ে। তাই এ বিষয়ে স্বস্তি খোঁজা উচিত। টোল ভার যেন কারো অস্বস্তির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।


সূত্র: ভোরের  আকাশ