ট্রাক-কাভার্ডভ্যান গায়েব যেন বাম হাতের খেল

Passenger Voice    |    ১১:১৮ এএম, ২০২১-০৯-২০


ট্রাক-কাভার্ডভ্যান গায়েব যেন বাম হাতের খেল

দশ বাই আট- টিন-কাঠের ছোট্ট খুপড়িঘর। বাঁশের ঠেকনায় ভর করে ঝাঁপ তোলা। সামনে রাখা দুটি তেলের ড্রাম। মবিলের ডিব্বা দিয়ে মালা গেঁথে আর এক টুকরো পাইপ বাঁশের খুঁটিতে ঝোলানো, মাথায় একটা ক্লিয়ার বাল্ব। খুপড়ির ভেতর একপাশে সিঙ্গল খাট পাতা। বালিশ, তোশক ও মশারিও আছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা থেকে কয়েকশ গজ সামনে গজারি বনের ধারে ছোট্ট এই ছাপড়ার মাসিক ভাড়া এক লাখ ২০ হাজার টাকা! চোরাই সিন্ডিকেটের হোতা বরিশাইল্যা জামানের আখড়া এটি। দেখে সাধাসিধে মনে হলেও এই খুপড়িঘরকে ঘিরেই চলে কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য। গাড়ির তেল থেকে শুরু করে চোরাই যন্ত্রাংশ- সব কিছুরই কেনাবেচা চলে এখানে। চোরাই সিন্ডিকেটটি জাল বিস্তার করে রেখেছে সারাদেশেই। ফলে কোনো ট্রাক কিংবা কাভার্ডভ্যান গায়েব করে দেওয়াও যেন তাদের বাঁ হাতের খেল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু বরিশাইল্যা জামানের আখড়াই নয়, গাজীপুরের সালনা থেকে হোতাপাড়া পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুপাশেই প্রায় ২৫টি এবং টঙ্গীর চেরাগ আলীতে একটি চোরাই মাল বেচাকেনার এমন দোকান রয়েছে। দীর্ঘদিন মাসোহারায় চলা এই কারবার চালাতে এখন পুলিশের টহল দলকে বখরা দিতে হয় প্রতিদিনই। এর বাইরেও সিন্ডিকেটের প্রতিটি সদস্যের কাছ থেকে চাঁদা নিয়ে গাজীপুর সদর থানার ওসিকে মাসোহারা হিসেবে দেওয়া হয় তিন লাখ টাকা। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই চলছিল। কিন্তু সেই নিয়মে বাদ সেধেছেন সদর থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম। কোনো কিছুতেই যেন তাকে ম্যানেজ করা যাচ্ছে না। সর্বশেষ সিন্ডিকেটের হোতা জামানের মাধ্যমে চেষ্টা করেও সুবিধা করা যায়নি বলে জানা গেছে। ওসির ভাষ্য- ‘চোরাই দোকান চলার কথা আমিও শুনেছি। শিগগিরই সেখানে অভিযান চালানো হবে।’

গাজীপুর জেলা ট্রান্সপোর্ট ঠিকাদার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দ্বীন মোহাম্মদ নীল মিয়া বলেন, ‘চোরাই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে ট্রান্সপোর্ট ব্যবসায়ীদের অনেকেই আজ পথের ফকির। কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও গাড়ির মালিক লাভের মুখ দেখেন না। অথচ সামান্য লোভে পড়ে অসাধু চালকরা চুরি করে গাড়ির তেল বেচে দেয়। আর এর সঙ্গে জড়িত কারবারিরা বছর না ঘুরতেই বনে যায় কোটিপতি।’ শিলা ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির মালিক নীল মিয়া আরও বলেন, ‘লিভার ব্রাদার্সের ২০ টন হুইল পাউডারসহ আমার একটি ট্রাক ছিনতাই হয়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থেকে পাউডার উদ্ধার হলেও প্রায় ২০ লাখ টাকা দামের ট্রাকটি আজও পাওয়া যায়নি। এই চোরাই সিন্ডিকেট দেশের প্রধান প্রধান মহাসড়ক এবং সারাদেশে জাল বিস্তার করে রেখেছে।’ খবর আমাদের সময়

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, কয়েক বছর আগে আমানত শাহ গ্রুপের শাড়ি ও লুঙ্গিবোঝাই একটি কাভার্ডভ্যান টঙ্গী থেকে ছিনতাই হয়। পরে মালামালসহ খিলগাঁও থেকে পুলিশ সেটি উদ্ধার করে। তবে ছিনতাই চক্রের সদস্যরা আজও ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে।

সম্প্রতি কথা হয় গাজীপুরের চোরাকারবারি সোহেলের সঙ্গে। তবে আমাদের সময়ের সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে নিজে তখন সাধু সাজার ভান করে। অকাতরে বলে যায় চোরাই ব্যবসার আদ্যোপান্ত। সোহের জানায়, রাত-দিন ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকে এসব খুপড়ি। সাধারণত চালকরা বাস, ট্রাক বা কার্ভাডভ্যান থামিয়ে তেল (চুরি) বিক্রি করে এগুলোতে। ফিড কোম্পানির ভুট্টা এবং ফিডমিলও নিয়মিত বেচাকেনা হয়। তবে সারাদেশ থেকে চুরি বা ছিনতাই হওয়া ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের মালামাল বেচাকেনা হয় জামান-মাসুদ-আয়নাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।

চোরের ওপর বাটপারি : সোহেলসহ কয়েকজনের সঙ্গেই কথা বলে জানা যায়, চালকের কাছ থেকে প্রতি লিটার ডিজেল কেনা হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। আর বিক্রি হয় ৬৩ টাকা। এখন প্রশ্ন আসতে পারে- লিটারে মাত্র ৩ টাকা লাভের জন্য চোরাকারবারিরা এত ঝুঁকি নেয় কেন? সোহেলরা অবশ্য জানায়, গাড়ির চালক তেল বিক্রি করতে এলে চোরাই সিন্ডিকেট তাদের ওপর বাটপারি করে। ট্যাংকি থেকে তেল নামানোর সময় সুযোগ বুঝে দুই থেকে তিন লিটার বেশি নিয়ে নেয়। অর্থাৎ ১০ লিটারের জায়গায় ১৩ লিটার। এতে লাভ প্রায় দ্বিগুণ হয়। একইভাবে ভুট্টা, ফিডমিল, কারখানার কাপড়, স্পিনিং মিলের সুতা, সয়াবিন তেলসহ নানান চোরাই পণ্যও কেনাবেচা হয় এসব আখড়ায়। আর চুরি বা ছিনতাই হওয়া ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান কেনাবেচা চলে মালামালসহ।

চার হাত বদল হয় চোরাই মাল : চোরাই হওয়া মালামাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চার হাত বদল হয়। প্রথম হাত গাড়ির চালক ও ছিনতাইকারী চক্র। এর মধ্যে চালক বাস, ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান মালিকের অগোচরেই নিয়মিত তেল বিক্রি করে। আর ছিনতাইকারী চক্র মালামালসহ সুযোগ বুঝে গাড়িও বিক্রি করে দেয় দ্বিতীয় হাত হিসেবে কাজ করা মহাসড়কের পাশে থাকা আখড়ার মালিকদের কাছে। এসব চোরাই মালামাল অর্ধেক কখনো কখনো আরও কমেই কিনে নেয় সিন্ডিকেটের এ সদস্যরা। তৃতীয় ধাপে থাকে পাইকার। আখড়া থেকে তার তেল বা অন্যান্য পণ্য সংগ্রহ করে। চতুর্থ ও শেষ ধাপের সিন্ডিকেট সদস্যরা সারাদেশে চোরাই পণ্য বিক্রির খুচরা দোকানদার। মূলত পাইকারের মাধ্যমেই এসব তেল বা পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যায়। তা ছাড়া শিল্পকারখানায় জেনারেটর বা ব্রয়লার চালানোর জ্বালানি হিসেবেও এসব চোরাই তেল সাপ্লাই দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এ কাজেও রয়েছে একটি সিন্ডিকেট। অপরদিকে কারখানার কাপড়, পোশাক বা সুতাজাতীয় চোরাই পণ্য কেনাবেচার চক্রও রয়েছে।

মাসে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন : গাজীপুরে গড়ে ওঠা প্রতিটি খুপড়িতে কম করে হলেও প্রতিদিন দুই থেকে তিন ড্রাম তেল জমে। সেই হিসাবে প্রায় ৭৫ ড্রাম তেল চুরি হয়। আর এক ড্রামে ডিজেল থাকে ২২০ লিটার। প্রতিলিটার ৬৫ টাকা দরে ৭৫ ড্রামের দাম পড়ে ১০ লাখ টাকার ওপর। এ হিসাব কেবল ডিজেলের ক্ষেত্রে। সয়াবিন, ভুট্টা বা ফিডমিলও চুরি হচ্ছে নিয়মিত। তা ছাড়া প্রতিদিন রাতে এক থেকে দুটি ট্রাক বা কাভার্ডভ্যানভর্তি চোরাই মালামালও বেচাকেনা চলে। সেই হিসাবে সক্রিয় চোরাই সিন্ডিকেট মাসে কয়েক কোটি টাকার বাণিজ্য করে বলে জানা গেছে।

মহাসড়কে চোরাই সিন্ডিকেট সদস্যরা : পোড়াবাড়ী এলাকায় বরিশাইল্যা জামান ও আয়নাল এবং হোতাপাড়ায় মাসুদ হচ্ছে সিন্ডিকেটের মূল হোতা। এদের সহযোগী হিসেবে কাজ করে চালক ও পাইকাররা। এ ছাড়া সেলিম, রাজ্জাক, বাদশা, আবুল কাশেম, ফিরোজসহ প্রায় ২৫ জনের একটি চক্র সক্রিয়ভাবে আখড়া বসিয়েছে। তা ছাড়া টঙ্গীর চেরাগ আলী এলাকায় রুবেল চোরাই তেলের কারবারি। আর প্রতিটি আখড়ায় সহযোগী হিসেবে ৫০০ টাকা রোজে খাটে আরও কয়েকজন যুবক। এরা মূলত গাড়ি থামানোর পাশাপাশি পাহারার কাজ করে।

সরেজমিন একদিন : পোড়াবাড়ী এলাকায় মহাসড়কের পূর্বপাশেই রাজ্জাকের আখড়া। চোরাই সিন্ডিকেটের বিষয়ে জানতে পেরে গেল ১৪ সেপ্টেম্বর সব কিছুই পর্যবেক্ষণ রাখছিলেন এই প্রতিবেদক। দুপুর ১২টার দিকে দেখা যায়, সেই খুপড়ি থেকে একটি পিকআপভ্যানে তেলের পাঁচটি ড্রাম উঠানো হচ্ছে। সেই দৃশ্যের ভিডিও ধারণ করতে গেলে প্রথমে কর্মচারী বাধা দেন। পরে এগিয়ে আসেন পিকআপচালক, পাইকার ও দোকানের মালিক রাজ্জাকাও। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে পরে যোগাযোগের আশ^াস দিয়ে পিকআপ নিয়ে সটকে পড়েন পাইকার। সব ফেলে পালিয়ে যান রাজ্জাক ও তার কর্মচারীও। বেলা ১টার দিকে ওই এলাকার আবুল কাশেমের আখড়ায় এক যুবক তেল ভরা একটি ড্রাম লুকাচ্ছিল। প্রতিবেদক গাড়ি থামিয়ে ভিডিও ধারণ করতেই দৌড়ে পালায় সেও। বেলা ২টায় ফের রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা। সেখানেই কথা হয় চোরাকারবারি মো. সোহেলের সঙ্গে।

ইতোমধ্যে সাংবাদিক আসার খবর সিন্ডিকেটের সবার কাছে পৌঁছে যায়। আধাঘণ্টা অপেক্ষার পর বেলা আড়াইটার দিকে হোতাপাড়ায় জামানের আখড়ায় গেলে দেখা যায়, একটি কাভার্ডভ্যান (ঢাকা মেট্রো-ট ১১-৮৪৮৫) থেকে তেল চুরি করা হচ্ছে। আরএসকে ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির ওই কাভার্ডভ্যানের চালক আনিস (ছদ্মনাম) জানান, ৬০ টাকা দরে তিনি ১০ লিটার ডিজেল বিক্রি করেছেন। ততক্ষণে সিন্ডিকেটের কয়েকজন সদস্য সেখানে হাজির হয়ে জামানের এক কর্মচারীকে গালাগাল করে- ‘ওই শালার..., তর মালিক বরিশাইল্যা না পুলিশ ম্যানেজ করছে। সবার কাছ থিক্যা ট্যাকা তুলছে। অহন আবার এইড্যা কী?’

সেখান থেকে বেরিয়ে পোড়াবাড়ীর তালুকদার সিএনজির পাশে আয়নালের আখড়ায় গিয়ে দেখা যায়, একটি কাভার্ডভ্যান বের হচ্ছে। চালকের কাছ থেকে জানা যায়, অভিযান চলছে তাই আজ তেল কিনবে না চোরাকারবারিরা। আখড়ার ভেতরে ছিল আরও একটি কাভার্ডভ্যান। সেটি থেকে নামানো হয়েছে ভুট্টা। এই প্রতিবেদকের উপস্থিতি টের পেয়েই আখড়ার ঝাঁপ বন্ধ করে দেয় আয়নাল। তার ভাষ্য- প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই সে ব্যবসা করে। তা ছাড়া তেল ব্যবসার একটি ট্রেড লাইসেন্সও তার আছে বলে জানায়। তবে কোনোভাবেই আখড়ার ঝাঁপ খুলতে রাজি হয়নি সে।

এদিকে বিকাল ৩টার পর চোরাই তেল বিক্রির প্রস্তাব দিয়ে হোতাপাড়ার মাসুদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। মাসুদ তৎক্ষণাৎ তেল কেনার আগ্রহ প্রকাশ করে নিউ বিলাস হোটেলের পাশে তার দোকানে যেতে বলে। তবে সাংবাদিক আসার খবর ইতোমধ্যে তার কানেও পৌঁছে যায়। অগত্যা সব বন্ধ করে সটকে পড়ে মাসুদও। পরে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে সিন্ডিকেটের হোতা চোরাকারবারি জামান তার কর্মচারী পাঠিয়ে এই প্রতিবদেককে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ জানায়। তবে নিজে এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করে।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে জয়দেবপুর থানার ওসি মো. মাহতাব উদ্দিন বলেন, ‘দ্রুতই এ ব্যপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ সিন্ডিকেটটির বিরুদ্ধে আগেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে জিএমপির উপপুলিশ কমিশনার (অপরাধ) মো. জাকির হোসেন বলেন, ‘এই চোরাই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এবার আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভবিষ্যতে যাতে আর এ ধরনের কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার চেষ্টা তারা না করে।’